অবশেষে ডাকসুর যাত্রা

editor ১৩ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ breaking জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:৩৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম কার্যনির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮ বছর গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ডাকসু ভবনের দ্বিতীয়তলার হলরুমে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। ভিপি নুরুল হক নুর এবং জিএস গোলাম রাব্বানীসহ ডাকসুর নবনির্বাচিত নেতারা এ সভায় যোগ দেন।

প্রথম কার্যনির্বাহী সভায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সিনেট প্রতিনিধি নির্ধারণ, ঢাবিতে রিকশা-সাইকেল চলাচলের বিষয়। এ ছাড়া ডাকসুর অভিষেককে স্মরণীয় করে রাখতে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করার কথা আলোচনা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অতিথি করা হবে। গতকাল ডাকসু ভবনে সভার শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী। এরপর মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে গোলাম রাব্বানী কেন্দ্রীয় সংসদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় সভাপতির কাছে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের অনুমতি নেন জিএস। সভাপতি ড. আখতারুজ্জামান এক বছরের জন্য অনুমতি দেন।

ডাকসুর প্রথম কার্যকরী সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাব তোলেন আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাহরিমা তানজিমা অর্ণি। এরপর সভায় বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করেন ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী। এ সময় ভিপি নুরুল হক নুর ও সমাজসেবা সম্পাদক আকতার হোসেন ওই প্রস্তাবে আপত্তি তোলেন।

সভা শেষে নুর সাংবাদিকদের বলেন, সভায় প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্যপদ দেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আমরা কোনো সমাধানে পৌঁছাইনি। আপনারা দেখেছেন, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এবং আমি নিজেও একটি অবস্থানে আছি যে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সে রকম একটি জায়গা থেকে আমি মনে করি না প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য ঘোষণা করা উচিত। আমার এই প্রস্তাবে কয়েকজন সমর্থন জানিয়েছেন।

নুর আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। এখানে তাকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ দেওয়া খুব বড় কিছু না। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে একটি বিতর্কিত অবস্থান রয়েছে বর্তমানে। আমরা যেখানে একদিকে দায়িত্ব নিচ্ছি আরেক দিকে আমার ভাইয়েরা বোনেরা এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। আমি ভিপি হয়েও তাদের ওই দাবিকে সমর্থন জানিয়েছি।

এরপর নুরের বক্তব্যের বিরোধিতা করে জিএস গোলাম রাব্বানী বলেন, ডাকসুর যে কমিটি রয়েছে সেখানে ২৩ জন এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন। কেবল ভিপি নুর দ্বিমত পোষণ করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। রাব্বানী বলেন, প্রস্তাবটি প্রাথমিকভাবে ২৩:২ অনুপাতে গৃহীত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীকে সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়টি সংখ্যাগত দিক থেকে গৃহীত হয়ে গেছে।

রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত
ঢাবি ভিসি ও ডাকসুর সভাপতি ড. আখতারুজ্জামান সভায় বলেছেন, প্রথম কার্যকরী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়েই ডাকসুর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলো। সভায় আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা হচ্ছে-বড় আকারের একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান করা হবে। সেখানে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হবে। বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কার্যকরী পরিষদকে। ভিপি, জিএস, এজিএসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা বিভিন্ন কমিটি করে আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে ডাকসুর সভাপতি ড. আখতারুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে সম্মানীত সদস্যপদ দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কেননা তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক শিক্ষার্থী। প্রায় তিন দশক পর ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে তিনি যে উৎসাহ দিয়েছেন, সদা সহযোগিতা করেছেন, যে আশ্বাস তিনি আমাদের দিয়েছিলেন তার সবই তিনি বাস্তবায়ন করেছেন, যার ফলে আমরা আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছিলাম। তিনি পাশে থাকায় এই নির্বাচন আয়োজনে নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী অনুভব করেছি। তার কারণেই মূলত, আজকের এই কার্যকরী পরিষদ পুনর্জীবিত হলো। এ কারণেই আমাদের কার্যকরী পরিষদের সবাই সহমত জ্ঞাপন করেছে।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ
পরে গতকাল বিকালে ডাকসুর নবনির্বাচিতরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এই শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- ভিপি নুরুল হক নুর, জিএস গোলাম রাব্বানী, এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ ২৫ সদস্যের নির্বাহী কমিটির সদস্যরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ডাকসুর সভাপতি ও ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে ডাকসুর নির্বাচিতরা সেখানে যান।

জানা গেছে, নির্বাচিতরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কার্যনির্বাহী সভায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে- সিনেট প্রতিনিধি নির্ধারণ, ঢাবিতে রিকশা-সাইকেলের আলাদা লেন, নির্দিষ্ট করে তিন থেকে সাড়ে তিনশ রিকশার রেজিস্ট্রেশন, ঢাবি এলাকার অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট পরিমাণ রিকশা ভাড়া নির্ধারণ, হল থেকে গণরুম, গেস্টরুম এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সিট দেওয়া বন্ধ করা। বিভিন্ন হলে নোটিস দিয়ে অছাত্র এবং বহিরাগতদের হল ত্যাগ করতে বলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ডাকসু ও হল সংসদের অভিষেককে স্মরণীয় করে রাখতে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অতিথি করা হবে।

ডাকসুকে লালকার্ড প্রদর্শন
ডাকসুর দায়িত্ব নেওয়ার দিনে কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি লালকার্ড প্রদর্শন করেছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র ঐক্য। গতকাল বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর বেলা সোয়া ১২টার দিকে ডাকসুর কার্যকরী সভা শেষ হলে তারা ডাকসু ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় তফসিল ও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দাবি জানান।

আজীবন সদস্য শেখ হাসিনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) আজীবন সম্মানিত সদস্য হলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল শনিবার দুপুরে ডাকসু ভবনের দ্বিতীয়তলার হলরুমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে এক সভায় তাকে এ পদ দেওয়া হয়।

ডাকসুর নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই প্রথম কার্যনির্বাহী সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে আজীবন সম্মানিত সদস্য করা হলেও এর বিরোধিতা করেছেন সংগঠনের ভিপি (সহ-সভাপতি) নুরুল হক নুর।

সভায় প্রধানমন্ত্রীকে ডাকসুর আজীবন সম্মানিত সদস্য করার সিদ্ধান্তের বিষয়টি ব্রিফ করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, ডাকসুর প্রথম কার্যনির্বাহী সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে আজীবন সম্মানিত সদস্য করা হয়েছে। আগামী সভায় বিষয়টির বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। ভিপি নুর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকসুর আজীবন সম্মানিত সদস্য করার বিরোধিতা করে সাংবাদিকদের বলেন, ডাকসুতে একটি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ছাত্র সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য করা ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রীর জায়গাটি সম্মানের। গত ১১ মার্চ ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ডাকসুতে ভিপি ও সমাজকল্যাণ পদ বাদে সব কয়টিতে জয় পায় ছাত্রলীগ।

সম্প্রতি সংবাদ