ব্রেকিং নিউজ

ঈদগাহ মাঠ ভরাটকে কেন্দ্র করে ভূমি কর্মকর্তাসহ তিনজনকে মারধর ৮৪জনের বিরুদ্ধে মামলা; গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামবাসী

editor ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

মুক্তার হাসান, টাঙ্গাইল:০৫ মে-২০১৯,রবিবার।
টাঙ্গাইলের বাসাইলে ঝিনাই নদীতে অবৈধ ড্রেজিং নিষেধ করায় ভূমি কর্মকর্তাসহ তিনজনকে মারধরের ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা ও এক দিনমজুরকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় ভূমি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বাদি হয়ে গত মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) বাসাইল থানায় ৪জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৮০জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর থেকেই গ্রেফতার আতঙ্কে এলাকাবাসী।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল বিকেলে উপজেলার কাশিল ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, অফিস সহকারী আলমগীর হোসেন ও উপজেলা ভূমি অফিসের নৈশ প্রহরী আবু মাসুদ খান কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী ঝিনাই নদীর দাপনাজোর এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য নিষেধ করেন। এসময় বালু ব্যবসায়ী ওই এলাকার জাকির, আনোয়ার, আব্দুল মান্নান, আসাদসহ একদল দুর্বৃত্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের তিনজনকে পিটিয়ে গুরুত্বর আহত করে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুন নাহার স্বপ্না ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুন নাহার ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। এসময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ওই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আরমান আলী জাকির (৬৪)কে ৬ মাসের ও দিনমজুর ইমান আলী (৬০)কে এক বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়।

স্থানীয়রা জানান, দাপনাজোর এলাকায় কবরস্থানের পাশে ঈদগাহ মাঠ তৈরি করার জন্য স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম ও উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলামকে অবহিত করে ঝিনাই নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু আনার কথা ছিল। ড্রেজার মেশিনও বসানো হয়। কিন্তু গত ২৮ এপ্রিল ঝিনাই নদীর পূর্বপাড়ের মানুষ ড্রেজারের কয়েকটি পাইপ ভেঙে ফেলে। এ নিয়ে দুইপাড়ের মানুষের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করে। পরেরদিন ২৯ এপ্রিল বিকেলে ৩জন লোক তাদের পরিচয় না দিয়ে ড্রেজারের পাইপগুলো ভাঙতে শুরু করে। পরে স্থানীয় লোকজন ওই তিনজনকে পূর্বপাড়ের মানুষ মনে করে পিটিয়ে আহত করে।

এদিকে ৩০ এপ্রিল ওই ঈদগাহ মাঠের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম ও উদ্বোধক হিসেবে উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলামের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। এছাড়াও ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুন নাহার স্বপ্না, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুন নাহার, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা রাজিকসহ আরও কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। এনিয়ে ঈদগাহ মাঠ কমিটির লোকজন তাদের অতিথি করে কার্ডও ছাপান। কিন্তু ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপির অনুষ্ঠান পন্ড হয়।

কারাগারে থাকা মুক্তিযোদ্ধা আরমান আলী জাকিরের স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ওইদিন মারামারি হওয়ার পর ইউএনও আসার খবর পেয়ে ঘটনান্থলে যান। সেখানে তাকে আটক করে জেল দেওয়া হয়েছে। তিনি ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিল না, তারপরও তাকে জেল দেওয়া হয়েছে।’

কারাগারে থাকা দিনমজুর ইমান আলীর স্ত্রী হাজেরা বেগম বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি তিনিই। দিন আনে, দিন খাই। আমার একমাত্র ছেলেটিও প্রতিবন্ধি। ওইদিনও অন্যের বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছিল। সেখান থেকে আসার পর তিনি ঘটনাস্থলে গেলে তাকে ধরে জেল দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় কল্পনা, জামিরন, মনোয়ারা, মাজেদা বেগমসহ বেশ কয়েকজন জানান, ‘ঈদগাহ মাঠ ভরাটের জন্য নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কথা ছিল। পরে ড্রেজার বসালে নদীর পূর্বপাড়ের লোকজন প্রথমে পাইপ ভাংচুর করে। পরেরদিন তিনজন লোক এসে আবারও পাইপ ভাংচুর শুরু করলে স্থানীয়রা তাদের তিনজনকে পূর্বপাড়ের মানুষ মনে করে মারধর করে। এঘটনায় ৮৪জনের নামে মামলা হয়েছে। এখন এলাকার সব পুরুষ মানুষ গ্রেফতার আতঙ্কে পলাতক রয়েছে। আমরা মহিলাও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।’

মুক্তিযোদ্ধাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদন্ড দেওয়ার বিষয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। ঘটনাটি শুনেছি। ওই এলাকায় গিয়ে খবর নিয়ে বিষয়টি জানবো। এরপর ব্যবস্থা নেবো।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুন নাহার স্বপ্না মামলা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে মুক্তিযোদ্ধাসহ দুইজনকে কারাদ-ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘গত ৩০ এপ্রিল দাপনাজোর এলাকায় ঈদগাহ মাঠের উদ্ধোধন করার জন্য আমার অনুমতি নিয়েই তারা কার্ডে আমার নাম ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে মাঠ ভরাটের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করায় সেটি বন্ধ করা হয়। এসময় ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তাসহ তিনজনকে মারধর করে স্থানীয়রা।

বাসাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এসএম তুহীন আলী বলেন, ‘এঘটনায় ৪জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৮০জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

কালের কাগজ/প্রতিনিধি/জা.উ.ভি

সম্প্রতি সংবাদ