এটাই প্রমাণ করে দেশে কী পরিমাণ দুর্নীতি চলছে: মির্জা ফখরুল

editor ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ breaking slider-top প্রধান খবর

কালের কাগজ ডেস্ক: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার।

দেশে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগের সভাপতি-সেক্রেটারির অপসারণের মধ্য দিয়ে এটা আজ প্রমাণিত যে, দেশে দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

সরকার বাংলাদেশে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছে এমন মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, যে গণতান্ত্রিক চেতনা বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সে চেতনা আজ ভূলুণ্ঠিত। তাই দল-মত নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান, আসুন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।

রোববার বিকালে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নজরুল ইসলাম খান।

ফখরুল বলেন, সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধ্বংস করে ফেলেছে, তারা এসবকে ধ্বংস করে ফেলেছে স্বৈরতান্ত্রিক বা অটোক্রেটিক প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এখন দেশে নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র, নির্বাচন করছে একটা দেখাচ্ছে স্বৈরতন্ত্র। এখানে দুইটি বিষয় আছে- একটা হচ্ছে পোশাক, পোশাক পড়ে ভাব দেখানো হয়- এটাই গণতন্ত্র, ভেতরে ভেতরে গণতন্ত্রের উল্টো।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে জনগণের কাছে আমরা যে বক্তব্যটি দিতে চাই তা হচ্ছে- আসুন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি, গণতন্ত্রের মুক্তি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা- এ কথায় উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে আমাদের দল-মত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে গণতন্ত্রের চেতনার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম, সেই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই লক্ষ্যে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে বদ্ধপরিকর।

গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে দলের মহাসচিব বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই- গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের দলের কমিটমেন্ট শতকরা ১০০ ভাগ। আমাদের দলই সেই দল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দল সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি (জিয়াউর রহমান) একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে নিয়ে এসেছিলেন এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তিনি (জিয়াউর রহমান) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন এবং বদ্ধ অর্থনীতি মুক্ত করে দিয়েছিলেন। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন।

সারা দেশে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরে চরম রাজনৈতিক নৈরাজ্য চলছে। বিরোধী দলের ওপর চলছে নিষ্পেষণ, অত্যাচার, গুম, খুন, হামলা। যে কোনো ব্যক্তি এই সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে তার বিরুদ্ধে নেমে এসেছে প্রশাসনের খড়গ। বিগত ১০ বছরে বিরোধী দলের প্রায় ২৬ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এক লাখের বেশি মামলা দেয়া হয়েছে। সরকার গুম-খুন-বিচারবহির্ভূত হত্যা-মিথ্যা মামলা, কাস্টডিওতে হত্যা- এসব একটা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সারা দেশে গত ১০ বছরে।

বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল বলেন, জাতিসংঘ আজ ( ১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে এই দেশ তাদের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী হয়েও কীভাবে এবং কী ধরনের একটি সরকার চালু রেখেছে যেখানে সে সনদের কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না। তাহলে কী এটা অযৌক্তিক হবে এটা মানছে না। আপনাদের মনে করে দেয়ার প্রয়োজন নেই আজ থেকে মাত্র সপ্তাহখানেক আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে বিশ্বের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময়ে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে- গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি বর্তমান সরকারের কথা ও কাজে কোনো মিল নেই। সম্প্রতি কানাডা সরকারও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ফখরুল বলেন, এ প্রসঙ্গে অ্যামিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনগুলোতে বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়গুলো স্পষ্টভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। গণতন্ত্রের মূল বাহন যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি ৩০ ডিসেম্বর-২০১৮-এর আগের রাতে কী ছিল তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই তা বিশ্বের সব নামি-দামি পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসী সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। শুধু একটি উদাহরণ দিয়ে আমি আপনাদের বুঝাতে চাই, নিউজ ম্যাগাজিন দি ইকোনোমিস্ট যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল তার শিরোনাম ছিল- বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মৃত্যুর ওপর একটি শোকবার্তা।

বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আইনবহির্ভূত খেয়াল-খুশি মতো হত্যাকাণ্ড ঘটানো, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম, বেআইনিভাবে আটক, জেলখানায় জীবনের প্রতি হুমকির পরিবেশ, বন্দিদের রুমে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিধি-নিষেধ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, সাইভার সিকিউরিটি আইন যা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার বড় রকমের আইন, খালেদা জিয়াকে আটক করে রাখার বিষয়গুলো তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, এই গণতন্ত্রহীন পরিবেশে সরকার হয়ত এই আত্মতৃপ্তি অনুভব করতে পারে তারা আজ পুরো বাংলাদেশ দখল করে নিয়েছে। আজকের বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই, তাদের সব কার্যক্রম স্তব্ধ করে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে। সরকারের সর্বশেষ কার্যক্রম এই সেদিন ছাত্রদলের কাউন্সিল ও নির্বাচন বন্ধ করে দেয়ার মধ্য দিয়ে আপনারা প্রত্যক্ষ করেছেন।

‘ছাত্রলীগের শীর্ষ দুইজনের অপসারণ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটাই (ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে দুর্নীতির দায়ে সরিয়ে দেয়া) প্রমাণ করেছে দেশে কী হারে দুর্নীতি চলছে, চাঁদাবাজি চলছে। এটাতে শুধু একটা প্রকাশ পেয়েছে যে, এটাতে একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি জড়িত তাদের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দেশের প্রধানমন্ত্রী বহিষ্কার করতে হয়েছে। এরকম সারা দেশে অনেক চলছে।

এটা প্রমাণ করে দুর্নীতি কোন্ পর্যায়ে চলে গেছে। এটা (বহিষ্কার) হচ্ছে স্বীকৃতি, রিকগনেশন। এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, তারা দুর্নীতি করছে।

এই বহিষ্কারকে আপনি কীভাবে দেখছেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, তাদের দল দুর্নীতি করছে এবং সবাই মিলে দুর্নীতি করছে। এটা তো রিকগনেশন অব করাপশন।

ছাত্রদলের কাউন্সিল প্রসঙ্গে এক প্রশ্রের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, আইন দিয়ে তো রাজনীতি হয় না। আমি সেদিনও বলেছি, যে এভাবে রাজনীতিকে আদালত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা- এখানেই আমাদের আপত্তি। এটা নজিরবিহীন ঘটনা। একটা রাজনৈতিক দলের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে আদালত এবং সেটা সরকারের উদ্যোগে, তারাই করাচ্ছে। এটাতে প্রমাণিত যে, এই সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বিরোধী দলে বিশ্বাস করে না। এটাই বাস্তবতা।

ছাত্রদলের প্রসঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ বলেন, দেশে দুই আইন চলছে। সরকারি দল হলে একরকমের আইন আবার বিরোধী দল হলে আরেক ধরনের আইন। যেমন আমরা পরিষ্কার দেখেছি যে, ১/১১তে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ২১টি মামলা ছিল, একটি মামলাও এখন নেই। কোনোটা বাতিল, কোনোটা চার্জশিট থেকে বাতিল ইত্যাদি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ট্রায়ালও ফেস করতে হয় না। একই ধরনের মামলায় বিএনপির নেতারা অভিযুক্ত ছিল তারা কিন্তু এখনও ট্রায়ালে সম্মুখীন হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, আজকে আমাদের নেত্রীকে বিচার করে বানোয়াট মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। তাকে জামিনও দেয়া হচ্ছে না। বিএনপি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, একটি নিম্ন আদালত রায় দিচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ হস্তক্ষেপ করতে পারছে। এটার সম্বন্ধে বিচারটা কে করবে? যেহেতু সরকার পুরো বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার যেভাবে চাচ্ছে সেভাবে হচ্ছে।

সম্প্রতি সংবাদ