ব্রেকিং নিউজ

স্থল পাকরাশী জমিদার শেরশাহ’র স্থাপত্য কৃতি ও পুর্ণস্থান চৌহালী

editor ২৩শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

মাহমুদুল হাসান, চৌহালী(সিরাজগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ ২৬ সেপ্টেম্বর-২০১৯,বৃহস্পতিবার।
দেশের ঐতিহ্য সিরাজগঞ্জের গর্ভ চৌহালীর স্থাপিত কৃতি পাকরাশী জমিদার শেরশাহ’র স্মৃতি বিজরিত স্থাপত্য কৃতি ও পুর্ণস্থান চৌহালী। কালের ¯্রােতে জমিদার শেরশাহ’র স্মৃতি বিজরিত ও স্থাপত্য কৃতি যমুনা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে।
ইতিহাস স্বাক্ষ দেয়, শেরশাহ তার রাজ্যে ভুমিকর আদায়ের লক্ষে ১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যে একটি জরিপ দল ভুমি জরিপ ও মৌজার নাম করণের জন্য শাহজাদপুর পুর্ব অঞ্চলে প্রেরণ করেন ভুমি জরিপ দল। চৌহালীতে জনশ্রতি আছে তারা এসে দেখতে পান চারজন কৃষক হাল-চাষ করছেন। হাল-চাষকৃত হাইলাদের হালের সংখ্যা চারজন । এভাবে স্থানটির নাম করণ করা হয় চারহালী। পরে বাংলা চার শব্দের ফারসি শব্দরুপ চৌযুক্ত হয়ে এখানে নাম করণ হয় চৌহালী। পুর্বে চৌহালী থানা এলাকা শাহজাদপুর থানায় অন্তভুক্ত ছিল।
আঠারো দশকের গোড়ার দিকে বা তারও আগে স্থল ইউনিয়নে স্থল পাকরাশী জমিদারের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তাদের উদ্যোগেই সিরাজগঞ্জের চৌহালী একটি প্রথম রাজস্ব থানা হিসেবে জন্ম নেয়। এক সময়ে শাহজাদপুর প্রশাসনিক থানার পুর্বাংশের চারটি ইউনিয়ন হচ্ছে- সদিয়াচাদপুর, স্থল, ঘোরজান ও উমারপুর। গ্রামকে আরও বেগমান করতে উমারপুর ইউপির কয়েকটি মৌজা নিয়ে মিরকুটিয়া নামে একটি ইউনিয়ন গঠিত হয়ে ইউনিয়নের সংখ্যা দাড়ায় পাঁচটি।
বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মত চৌহালীর মানুষ সাধারণত পাড়া গ্রামে দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করে। এছাড়াও যমুনা নদীর বুকে জেগে উঠা চরসমুহ বিচ্ছিন্ন ভাবে বাড়ী ঘর করে এ সব দলে সমগোষ্ঠীর লোক বেশী থাকে। প্রত্যেক গোত্রে বা গ্রামে এক বা একাধিক দলপতি বা মাতব্বর প্রধান থাকে। তারা সামাজিক বিচারাধীন বড়বড় জটিল সমস্যা মোকদ্দমা মারামারী খুনা খুনি জবর দখল ইত্যাদির কারণে সৃষ্ট অনেক বিরোধ এক বা একাধিক সমাজের দলপতিগন একত্রে বসে বিষয়গুলো মিমাংসা করে থাকেন। পুরুষরাই চেীহালীর সমাজ পরিচালনা করে আসছেন। নারীদের ভুমিকা এ ক্ষেত্রে নগোন্য,এ সমাজেব বসবাসকারি সমাজিরা এ সমাজের প্রধানদের পরামর্শ আদেশ নির্দেশ সাধারনত মেনে চলেন বলে জানা গেছে।
নবান্নের সময় ভাপা চেতাই দুধের পিঠা,কুসলী, তেলের পিটা,পাটি সাপটাসহ মুড়ি, মুরুক খৈ, মোয়া, গুরের খির, চিনির পায়াস ইত্যাদি সখ করে তৈরি করে আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াত। বর্ষা মৌসুমে চৌহালী প্লাবিত হলে এলাকার লোকজন তেমন কোন কাজ থাকে না। অবসর সময়ে টাকুর দিয়ে পাটের রশি, মাছ ধরার জাল বুনানো, ধিয়ার দোয়ার, দারকিসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র তৈয়ারি করেন। রাত্রিতে পুতি পড়া ও গল্প বলা আসরে অনেক লোকের সমাগোম হয়। হাডু-ডু, দাড়িয়া বান্দা, ষাড়লড়াই, ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতা, লাঠি খেলা, চগো-মই দৌড় প্রতিযোগিতা সেকালের চৌহালীর মানুষের সাংস্কুতিক অংশ ছিল। বর্ষা মৌসুমে একে ওপরের মাথায় বিলিকাটা, কাথাসেমাই, পিঠার ধুম বা নৌকা করে আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া ছিলো মহিলারাদের বিনোদন। বর্তমানে চৌহালীতে প্রায় ৯৯% লোক মুসলিম খুবই অল্পসংখ্যক হিন্দু সম্পদায়ের লোক বসবাস করে।এখানে ধর্ম সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধুর স্পপ্নের সোনার বাংলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ১৯৮৫ সালে আরও ২টি ইউনিয়ন স্থাপনের মধ্য দিয়ে যমুনা নদীর চরে(শিবির নামক স্থান) বিশাল জায়গা জুরে গরে উঠে চৌহালী উপজেলা। উপজেলায় ১১০টি গ্রাম ও ১৫২টি মৌজার নিয়ে ২৪৩.৬৭ বর্গ কিলোমিটার আয়োতন জুরে ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা স্থাপিত হয়। এখানে জনসংখ্যা প্রায় ২লক্ষ এবং প্রায় ১লক্ষ ভোটার রয়েছে। যমুনা নদী বেষ্টিত ও তিনভাগে বিভক্ত যমুনার পশ্চিমপাড়ে এনায়েতপুর থানা, মাজপথে পানি আর বালুর মিতালী (বিশাল চর) নদীর পুর্ব পাড়ে উপজেলা সদর চৌহালী, উত্তরে টাঙ্গাইল সদর ও বেলকুচি উপজেলা, দক্ষিনে পাবনা জেলার বেড়া, পশ্চিমে শাহজাদপুর উপজেলা, দক্ষিন পুর্বে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর ও নাগরপুর উপজেলা অবস্থিত। সিরাজগঞ্জ সদর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে চৌহালী সদর দুরত্ব প্রায় ১’শ কিলোমিটার,সড়ক পথ। এছাড়াও এনায়েতপুর ক্রোস বাধ নৌঘাট থেকে নৌ-পথে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চৌহালী সদর(নৌঘাটে) আসা যায়, যার ভাড়া ৫০টাকা। চৌহালী থেকে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও রাজধানি সরাসরি বাস না চললেও যোগাযোগ সহজ। যমুনা সেতু আরিচা আঞ্চলিক মহাসড়কের টাঙ্গাইল থেকে ২৫ কি,মি,দক্ষিনে নাগরপুর উপজেলা। নাগরপুর বাজার বটতলা থেকে ১২ কি,মি,পশ্চিমে অবস্থিত চৌহালী উপজেলা। টাঙ্গাইলের যমুনা সেতু আরিচা আঞ্চলিক মহা সড়কে সরাসরি বাস চলাচল না করলেও জেলাসদর বেবীষ্টান থেকে নাগরপুর আসার জন্য রয়েছে বাস ও সিএনজি। বাস ভাড়া ৩০ টাকা ও সি এন জি ভাড়া ৬০ টাকা জনপ্রতি। নাগরপুর থেকে চৌহালী সদর পর্যন্ত সি এন জি,অটো টেম্প বা ইজি বাইক এর মাধ্যমে ৩০ টাকা ভাড়ায় আসা যায়। টাঙ্গাইল আরিচা ও চৌহালী সড়কের দু-পাশে সবুজে ঘেরা মনরম পরিবেশ ও নজর কাড়া দৃশ্য দেখে মনভরে উঠবে। টাংগাইল জেলাসদর থেকে ৩০ মিনিটের রাস্তায় ধলেশ্বরী নদী। বর্তমানে ধলেশ্বরী নদীবক্ষ শামসুল হক সেতু নির্মান হওয়ায় এলাকা নয়নাভিরাম। এক সময়ের উথাল দরলা নদী এখন শান্তধলেশ্বরী নদী একে বেকে বয়ে গেছে, এখন মড়া নদীতে পরিণত। গোধুলীর লগ্নের আলো আধারির খেলায় দৃশ্য দেখারমত স্পট ধলেশ্বরী সেতু, কেদারপুর ব্রীজ এবং যমুনা নদী দেখার জন্য অনেকেই আসেন।
চৌহালী উপজেলা আ’মীলীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহ্জ মোঃ হযরত আলী মাষ্টার জানান, স্থল পাকরাশী জমিদার শেরশাহ’র দাপটে শিংহ আর ছাগলে এক ঘাটে পানি ক্ষেত, তার আমল কালে তাদের অত্যাচারে মুসলমান জুতা ও ছাতা নিয়ে হাটতে পারেনি। কালের স্্েরাতে তা হারিয়ে গেছে, শেরশাহ’র স্মৃতি বিজরিত পুর্ণস্থান স্থল পাকরাশী জমিদারবাড়ি চৌহালী উপজেলার স্থল ইউনিয়ন। জমিদার তার এলাকায় শিক্ষার প্রসার ও বেগভান করে তুলতে নির্মান করেন স্থল পাকরাশী ইন্সটিটিউট নামে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জমিদার শেরশাহ কর্তৃক নির্মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কালের পরিবর্তনে যমুনা গ্রাস করে, পরে স্কুলটি শাহজাদপরের খুকনি ইউপিতে বর্তমানের অবস্থিত। জমিদারিত্ব শেষ হলেও শেরশাহর সেই স্কুলটি এখন কলেজ।
চৌহালীর কৃতিসন্তান, পঙ্গু হাসপাতাল(নিটোর)ঢাকা(অর্থো-সার্জারি) অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এ প্রতিবেদককে জানান, জমিদার শেরশাহ তাররাজ্যে ভুমিকর আদায়ের লক্ষে ১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যে একটি জরিপ দল মৌজার নাম করণের জন্য শাহজাদপুর পুর্বাঅঞ্চলে প্রেরণ করেন। জনশ্রতি আছে কৃষক হাল-চাষ করছে এ হাল-চাষকৃত হাইলাদের হালের সংখ্যায় চৌহালীর নামকরণ হয়। প্রয়াত এমপি প্রফেসর শাহজাহান চৌহালী নিয়ে একাট বই বের করেন। তিনি আরও বলেন যমুনা নদীর কড়াল গ্রাসে জমিদার বাড়ি ও নীল কড়রা হারিয়ে গেছে, হারিয়েছে শত শত ঘর বাড়ী ও শিক্ষাঅঙ্গন,সড়ক ও আবাদি জমি, উপজেলা পরিষদ হারিয়ে যাচ্ছে এবং গুগুল থেকে চৌহালীর মানচিত্র। ভাঙ্গন কবল থেকে উপজেলার পুর্ব অঞ্চল ্এবং প্রকৃতিক জীবকুল রক্ষার্থে বেরীবাধ ও ক্রোসবাধেই বদলে দিতে পারে চৌহালী ও দক্ষিন টাঙ্গাইল বাসির ভাগ্য।

সম্প্রতি সংবাদ