ব্রেকিং নিউজ

বন্দীদশা থেকে ফিরে এসে লোমহষর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিলেন এক নারী আইনজীবী

editor ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি ঃ ৫ নভেম্বর-২০১৯,মঙ্গলবার।
‘ও আমাকে প্রতিদিন মারতো। পাটা-পুতার পুতা দিয়ে আঘাত করতো, যাতে কেউ মারধরের আওয়াজ না পায়। আমার সারা শরীর থেতলে গেছে ওই আঘাতে। আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আত্মহত্যার। কিন্তু সেই সুযোগও পায়নি। আমি সেখান থেকে জীবিত ফিরে আসতে পারবো সে আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। বিয়ে এক মাসের মধ্যে প্রতারক স্বামীর ১৫ দিনের বন্দীদশা থেকে ফিরে এসে এভাবেই তার উপর নির্যাতনের বর্ননা দিলেন মানিকগঞ্জ জেলা জজকোর্টের আইনজীবি কামরুন্নাহার সেতু। বন্দীদশা থেকে ফিরে এসে সোমবার রাতে মানিকগঞ্জ সদর থানায় প্রতারক স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আইনজীবী কামরুন্নাহার সেতু।
মামলার এজাহারে কামরুন্নাহার সেতু উল্লেখ্য করেছেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগরে গ্রামে মো. শাওন মিয়া সাথে তার পরিচয় হয়। এর পর ‘গত ৯ সেপ্টেম্বর শাওন তাকে ১০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে করে। আর বিয়ের কথা কাউকে বলতে নিষেধ করে। মান সম্মানের ভয়ে, বিয়ের বিষয়টি কাউকে কিছু বলি নাই।’
‘গত ১৭ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জজকোর্ট থেকে কথা আছে বলে শাওন তাকে তার প্রাইভেট কারে উঠিয়ে নবীনগর কহিনুর গেটের তুনু হাজীর ৬ তলা বাড়ির ৪ তলার একটি কে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে স্ত্রী হিসেবে রাখে। সেখানে প্রথম দুদিন তার সাথে ভাল ব্যবহার করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৩য় দিন তার মানিকগঞ্জ ডাকঘরে থাকা কয়েকটি হিসেব থেকে তাকে টাকা উঠিয়ে দিতে বলে। তার কাছে অন্ত্র আছে, ভয়ে তিনি তাকে ৫ লাখ, ১০ লাখ এবং ১ লাখ করে ৩ বার টাকা উঠিয়ে দিতে বাধ্য হন। এর দুদিন পর শাওন তার কাছে আরো টাকা চায়। তার কাছে আর সঞ্চিত টাকা নেই জানালে সে তাকে তার নামে থাকা জমি লিখে দিতে বলে। তিনি তাকে জমি লিখে না দেয়ায়, তার ওপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। তার কাছ থেকে নিয়ে নেয় মোবাইর ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স। তার পর তাকে বিবস্ত্র করে নগ্ন ভিডিও ধারণ করে এবং তার শেখানো কথা বলিয়ে তারও ভিডিও রেকর্ড করে। সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ি দেয়ার হুমকী দেয়।সারাদিন তাকে ওই কে আটকে রেখে মারধর করতে থাকে। ঘরের মধ্যে থাকা পাটা-পুতার পুতা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। এতে তার মুখমন্ডলসহ বিভিন্ন অংশ থেতলে যায়।
সবশেষ গত ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে তাকে হত্যার হুমকী দেয়। জানে বাঁচতে তিনি তার করে জানালা খুলে এক প্রতিবেশীকে রাতে না ঘুমিয়ে একটু সজাগ থাকতে বলেন। তাকে বাঁচাতে আকুঁতি জানায়। রাত দুইটার দিকে তাকে মারধর শুরু করে। জবাই করতে রান্না ঘর থেকে বটি আনতে গেলে সে আর্ত চিৎকার শুরু করে। তার আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা চলে আসে। শাওন প্রতিবেশীদের জানান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাইরের লোকের কোন কথা থাকতে পারে না। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ণ এবং আর্তচিৎকারে বাড়ির মালিক এসে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে পৃথক একটি কে রাখেন। পরে দিন বাবা বাড়িতে দিয়ে আসার কথা বলে তাকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে যায়। চিকিৎসার নামে একটি হাসপাতালে নিয়ে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে শাওন। এটা বুঝতে পেরে সেতু সেখানে থেকে চলে আসতে চাইলে তাকে সেখানে মারধর শুরু করে। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপ পুলিশকে খবর দিলে সেখান থেকে শাওন পালিয়ে যায়। পরে সেখান উদ্ধার হয়ে ঢাকার উত্তারায় তার এক পরিচিত ব্যক্তির বাসায় রোববার রাত্রিযাপন শেষে সোমবার রাতে তিনি সরাসরি মানিকগঞ্জ থানায় এসে তার উপর গত ১৫ দিনের বিভিষীকাময় ঘটনার বর্ণনা দেন।
কামরুন্নাহার সেতু আরো বলেন শাওন একজন প্রতারক । তার কাজই হলো প্রতারনা করা। ‘প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়াই ওর কাজ। ও যে কত নারীর জীবন নষ্ট করেছে, কতো মানুষকে পথে বসিয়েছে- তা ও নিজেই বলতে পারবে না। ও প্রথমে নারীদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। নানা প্রলোভনে ফেলে তাদের অন্তরঙ্গ মেলামেশার ভিডিও ধারণ করে। নিয়ে নেয় মোবাইল ফোন, আইড কার্ড কিংবা অন্য কোন পরিচয়পত্র। তারপর তাকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়। না দিলেই শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন।’
আর এইসব অপরাধ ঢাকতে সে পুলিশসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে। নিজেকে অনেক বিত্তশালী ও বড় মাপের ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে খুব সহজেই মিশে যায় তাদের সাথে। ব্যবহার করে প্রাইভেটকার। রাজধানীর মতিঝিলে জনি টাওয়ারে নাকি তার ফ্যাট আছে।
জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে মানিকগঞ্জে আসার পর অ্যাডভোকেট কামরুন্নাহর সেতু আরো জানান, তার বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের ঢাকুলী গ্রামে। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তিনি উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে মোরশেদকে নিয়ে তিনি তার বাবার বাড়িতে থাকেন। তিনি ২০১৩ ও ২০১৪ সালে মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবি সমিতির নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সদস্য হন। স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের সুযোগে তার সাথে শাওন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
কামরুন্নাহার সেতুর পিতা মো. সফিউদ্দিন বলেন, তার মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর শাওন তার কাছে ফোন করে তার মেয়েকে দিয়ে ৫ লাখ টাকা চায়। না দিলে তাকে হত্যা করার হুমকী দেয়। তিনি গত ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ থানায় শাওনের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা করেন।
মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি তদন্ত) মো. হানিফ সরকার বলেন, ওই নারী আইনজীবিকে তার বাবার করা অপহরণ মামলায় উদ্ধার দেখানো হয়েছে। বিকেলে নির্যাতনের শিকার ওই আইনজীবী আদালতে ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। সন্ধ্যা তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে অভিযুক্ত মো. শাওন মিয়ার দুটি মোবাইল ফোন বন্ধ থাকার যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বিধায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কালের কাগজ/প্রতিনিধি/জা.উ.ভি

সম্প্রতি সংবাদ