আজ ভয়াল ২২ নভেম্বর ঘিওরের তেরশ্রীতে গনহত্যা দিবস

editor ২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

রামপ্রসাদ সরকার দীপু ঘিওর( মানিকগঞ্জ):২১ নভেম্বর-২০১৯,বৃহস্পতিবার।
আজ ভয়াল ২২ নভেম্বর। ঘিওরের তেরশ্রীতে গনহত্যা দিবস। পাক হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর এবং রাজাকার,আলবদর আলসামস বাহিনীর সদস্যরা ১৯৭১ সালের এই দিনে বর্বোরচিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামের তৎকালীন জমিদার সিদ্ধেশরী প্রসাদ রায় চৌধুরীসহ ৪৩জন গ্রামবাীকে গুলি করে এবং বেওনেটের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জমিদার সিদ্ধেশরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে হাত,পা বেঁধে শরীরে পেট্রোল ঢেলে জালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নিরীহ গ্রামবাসীর উপর বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকান্ডের করন জানতে চাওয়াতে ঘাতকরা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে – খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান সহ ৪৩ জন গ্রামবাসীকে। তবে দুঃখ জনক হলেও সত্য,স্বাধীনতার ৪৮টি বছর অতিবাহিত হবার পরেও নিহতদের পরিবারের খোজ খবর কেউ রাখেনি। এবং কি বিচার হয়নি এই জঘন্যতম হত্যাকান্ডের। জানা গেছে, ঘিওরের তেরশ্রী গ্রামের মানুষগুলো ছিল সাংস্কৃতিক মনা। বাম রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেরশ্রী গ্রাম। মুক্তিযোদ্ধদের আনাগোনা ছিল জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশী। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর দোসররা টার্গেট করে এই গ্রামটিকে। গোপনে শিক্ষানুরাগী, মুক্তিযোদ্ধা,ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবিদের তালিকা করে প্রস্তুত করে দালালেরা। নীল নকশা করে এই গ্রামটিকে ধ্বংস করার। ১৯৭১’ সালের ২২ নভেম্বর ভোর কেটে সূর্য ওঠার মুহূর্তেই পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী ও দেশীয় রাজাকার ঘিরে ফেলে তেরশ্রী গ্রামের সেন পাড়ার কালি মন্দিরটি। ২১ নভেম্বর রাতে এদেশীয় দালালদের নিয়ে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী গোপনে একটি মিটিং করে তেরশ্রী গ্রামে সেনপাড়া কালিবাড়ী মাঠ প্রাঙ্গনে। তারা পরিকল্পনা করে ২২ নভেম্বর হত্যাযঞ্জের। ঘিওর থেকে সিধুঁনগর গ্রামের মধ্য দিয়ে শতাধিক পাকিস্থানি সেনা এদেশীয় ঘাতকদের সহযোগিতায় ভারি অস্্র নিয়ে তেরশ্রী গ্রামে পৌছেঁ। কনকনে শীতের সকাল অনেকেই ঘুম থেকে উঠেনি। ঠিক সেই মূহুর্তে পাকিস্থানি সেনারা অতর্কিত হামলা চালায় গ্রামটিতে। ঘরে ঘরে জ¦ালিয়ে দেয় আগুন। ঘর থেকে বের হবার সুযোগ দেয়নি গ্রামবাসিকে। বৃষ্টিরমত গুলি ছুড়তে থাকে নিরীহ গ্রামবাসীর উপর। তাদের চিৎকারে পুরো এলাকা কম্পিত হয়ে উঠে। অপরেশনের সময় এদেলীয় দালালরা মুখোশ পরে নেয় যাতে তাদের কেউ চিনতে না পারে। মাত্র ৬ ঘন্টার অপারেশনে ঘাতকরা একের পর এক বেওনেট চার্জ করে এবং গুলি করে ৪৩ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। বেলা ১২টার মধ্যে হত্যাযজ্ঞ শেষ করে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীরা চলে ঘিওর সদরে। এই সময় পুরো এলাকা রক্তে ভেসে য়ায।লাশগুলো কোন রকম দাফন করা হয়। হত্যাযজ্ঞের পরে বহু হিন্দু পরিবার অন্যত্র চলে যায়। দেশ স্বাধীন হবার পরে বিপন্ কিছু মানুষ আবার ফিরে আসে তারে বাপ দাদাদের ভিটায়। তবে সে দিনের সেই নৃশংসতা কিছুতেই তারা ভুলতে পারেনি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হবার পরেও সেন পাড়া গ্রামের মানুষগুলো এই হত্যাকান্ডের বিচার পায়নি। নিহত ৪৩ জনের মধ্যে ৩০ জনের পরিচয় পাওয়া যায়। তেরশ্রী জমিদার সিদ্ধেশরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান, স্থানীয় স্কুলের দপ্তরী মাখন চন্দ্র সরকার,যাদপ চন্দ্রদত্ত, তার পুত্র মাধব চন্দ্র দত্ত,সাধা চরন দত্ত, শ্যামা লাল সুত্রধর, নিতাই চন্দ্র দাস, জগদিশ চন্দ্র দাস, সুধনা চন্দ্র দাশ, সুরেন্দ্র চন্দ্র দাশ, প্রাণ নাথ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, সাধন কুমার সরকার, যোগেশ দাশ,রামচরন সুত্রধর,রাধাবল্লভ, ভোলা নাথ, জ্ঞানেন্দ্র ঘোষ, যোগেশ সুত্রধর, মোঃ কফিল উদ্দিন, মোঃ গেদা মিয়া, মোঃ একলাছ মিয়া, শ্যামা প্রসাদ নাগ, নারায়ন চন্দ্র সুত্রধর, যোগেন্দ্র নাথ গোস্বামী যোগেশ চন্দ্র, গৌর চন্দ্র দাস,মোঃ তফিল উদ্দিন, তাজ উদ্দিন,মনিন্দ্র চন্দ্র দাশ। সরেজমিন পরিদর্শনকালে ২২ নভেম্বর নিহত শহীদ মাখনের চন্দ্র সরকারের ছেলে মনোরঞ্জন সরকার (৭৪) সাংবাদিকদের জানান, আমার বাবা পেশায় ছিলেন তেরশ্রী স্কুলের কেরানী। ঘটনার দিন রাতে আমাদের দেশীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্থানি সেনারা আমার বাবাকে রাতে তুলে নিয়ে যায় এবং প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। আমি তখন সবে মাত্র দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র। স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হবার পরেও আমাদের পরিবারের কেউ খবর রাখেনি। দুঃখ জনক হলেও সত্য,বয়স্ক, ভিজিডি কার্ডসহ কোন প্রকার সাহায্য করা হয়নি আমাদের । বর্তমানে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। শহীদ জমিদার সিদ্ধেশরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর একমাএ সন্তান তেরশ্রী কালী নারায়ন ইনষ্টিটিউটের শিক্ষক সমেশ^র প্রসাদ রায় চৌধুরী জানান, ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর আমার পিতাসহ ৪৩জন গ্রামবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সে দিনের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে আমার শরীর শিহরে ওঠে।
তেরশ্রী শহীদ স্মৃতি পরিষদ উদযাপন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার আব্দুল আজিজ মিয়া জানান,ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি আন্দোলনে তেরশ্রী গ্রামের কৃতিত্ব রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে তেরশ্রীতে ৪৩ জন শহীদদের স্মরনে দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য লোকজন স্মৃতিস্তম্ভ দেখার জন্য আসে। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিষ্ট তেরশ্রী শহীদ স্মৃতি স্তম্ভো বাস্তবায়ন কমিটির সাবেক সাধারন সম্পাদক মোঃ মজিবর রহমান জানান, বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের অকান্ত প্রচেষ্ঠায় শহীদদের স্মরনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা হয়। তবে নিহত ৪৩ জন শহীদদের বিচার আজও করা হয়নি।
মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক আলহাজ¦ এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয় বলেন, ঐতিহাসিক তেরশ্রীতে মুক্তিকামী মানুষের জীবন দানের ইতিহাস আছে। নৃশংস হত্যাকান্ডে যারা নিহত হয়েছে তাদের পরিবার পরিজনের খোঁজ খবর আমাদের রাখা দরকার। বর্বরোচিত হত্যাকান্ডটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রী বাজারে প্রবেশ করতেই ঘিওর- দৌলতপুর- টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে নির্মান করা হয়েছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ৩০ ফুট উচ্চতর ২টি স্তম্ভ মূল বেদির উপর দন্ডায়মান দৃষ্টিনন্দন নকশায় ২০১২ সালে নির্মান করা হয়েছে। প্রতিদিন যাত্রা পথে বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলারসহ গ্রামীন জনপদের মানুষ ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে এমন একটি নান্দনিক স্থাপনা দেখে মুগ্ধ হয়েছে। এ বছর শহীদ স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে ২২ নভেম্বর পালনের ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকালে শোভাযাত্রা, কালোব্যাজ ধারন, পুস্পস্তবক অর্পণসহ ব্যাপক কর্মসুচির আযোজন করা হয়েছে।

কালের কাগজ/প্রতিনিধি/জা.উ.ভি-সময়-১:৭ মিনিট

সম্প্রতি সংবাদ