ব্রেকিং নিউজ

মানিকগঞ্জে নৌকার হাট জমে উঠেছে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা

editor ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ বিনোদন সারাদেশ

রামপ্রসাদ সরকার দীপু,স্টাফ করেসপন্ডেন্ট:ঘিওর (মানিকগঞ্জ): ১৪ জুলাই-২০২০,
মানিকগঞ্জে পদ্মা যমুনা ধলেশ^রী, কালীগঙ্গা, ইছামতিসহ বিভিন্ন নদনদীতে পানি বৃদ্ধি পাওযায় জেলার ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় , হরিরামপুর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর উপজেলাতে বহু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তাই বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এসব এলাকাতে নৌকা তৈরি এবং বিক্রির ধুম পরে গেছে। ঘিওর, দৌলতপুর উপজেলার প্রায় ২০/২২ টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত নিম্নাঞ্চল বর্ষার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় নৌকার কদর বেড়ে গেছে বহুগুন। দুর্গত এলাকার লোকজন নৌকার কেনার জন্য দেড়শ বছরেও ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে ভিড় করছেন । তবে এ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন শত-শত ডিঙ্গি নৌকাসহ বিভিন্ন রকমের নৌকা বিক্রির জন্য সাজিয়ে রেখেছে নৌকা হাটায়। অনেকে এ মৌসুমে নৌকা বিক্রি করে তাদের জীবন যাত্রার মান বদলে যাবে।
মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর দুর্গম চর এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাফেরা করা সম্ভব হয়না। তাই বর্ষা আসার আগেই ঘিওর, দৌলতপুর এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাঠ মিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি এবং মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের মালামাল এবং জীবন জীবিকার একমাত্র বাহন হিসাবে নৌকার ব্যবহার দীর্ঘদিনের। বর্ষা কবলিত এলাকার লোকজন পারাপারে পুরোদমে ব্যবহার হচ্ছে নৌকা। নৌকা তৈরির শিল্পীরা প্রতি বুধবার জেলার ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে নৌকা বিক্রির জন্য আসে। নৌকা তৈরি সাথে জরিত শিল্পীরা স্থানীয় উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করছে নৌকা। ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, হরিরামপুর এলাকার নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে মিস্ত্রি পাড়ার নারী পুরুষ।
বর্ষার আগমনে মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর, শিবালয়, বেশ কয়েকটি এলাকা নির্মাঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তাঘাট ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেছে। এই সব অঞ্চলের লোকজনের যাতায়াতের একমাত্র বাহন হয়ে উঠে নৌকা। অন্যান্য বছরের মতো এবারও বর্ষার শুরুতেই জেলার ঘিওর উপজেলা বাসষ্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকাতে ঈদগা মাঠ এবং ঘিওর ডি, এন হাই স্কুলের মাঠের এক পাশে নৌকা বিক্রির হাট জমে উঠেছে। হাজার হাজার ধরনের ছোট বড় নৌকা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ঘিওর বাজারে কাঠ মিস্ত্রি পাঞ্জু শাহ, মাসুদ নিরঞ্জন সুত্রধরসহ অনেক মিস্ত্রিরা জানান, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই তারা তাদের কর্মচারিদের নিয়ে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতি সপ্তাহে তাদের কারখানায় ২০ থেকে ২৫টি নৌকা তৈরি হয়। ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর, এবং মহদেবপুর এবং তরা হাট বাজারে তারা নৌকা বিক্রি করে। বর্তমানে লৌহা কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় নৌকা তৈরির খরচ বেড়ে গেছে। নৌকা প্রকার ভেদে প্রতিটি ডিঙ্গি নৌকা ৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রয় করা হয়। তবে লাভের অংশ আগের থেকে কমে গেছে। কাঠ মিস্ত্রি সুবল সুত্রধর জানান, আমাদের বাপ দাদাদের আমল থেকেই আমরা নৌকা তৈরি করে বিক্রি করি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে আদাদের বাড়িতে নৌকা তৈরি ধামধুম শুরু হয়। আমরা জৈষ্ঠ মাস থেকে নৌকা তৈরি শুরু করে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বিক্রি করে থাকেন। বর্তমানে এলাকায় ছোট ডিঙ্গি ও কোষা নৌকা বেশি চলে। তবে কড়ই, জাম্বল,আম,ও কদম কাঠের নৌকা বিভিন্ন হাট বাজারে বেশি চলে। জাতি কাঠের তৈরি নৌকায় অনেক খরচ হয়। তবে এ পেশার সাথে জড়িত লোকজনের তেমন কদর নেই। উপজেলার বানিয়াজুরি, বালিয়াডাঙ্গি, সিংজুরি, বেগুন নারচি, হিজুলিয়া, ঠাকুরকান্দি, বেগুন নারচি, দৌলতপুর উপজেলার জিয়নপুর,বাচামারা, বাঘুটিয়া,খলসি,ধামস্বর, কলিয়া, বিনোদপুর, এবং শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ, উথলি, মহাদেবপুর এলাকার নিম্নঞ্চলের বর্ষার একমাত্র বাহন নৌকা। হাট বাজারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকা বিক্রি হয়। ঘিওর হাটে নৌকা বিক্রি করতে আসা নিরঞ্জন সুত্রধর জানান, তিনি এ বছার ২৫টি নৌকা তৈরি করেছেন। ছোট ছাইজের ডিঙ্গি নৌকা ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা এবং মাঝারি সাইজের নৌকা ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার এবং বড় সাইজের নৌকা ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। চলতি মৌসুমে ্এখনও তেমন বিক্রি শুরু হয়নি। পানি বাড়লে কেনাবেচা হবে । তবে শুরুতেই এবার নৌকার দাম একটু বেশি। তিনি আরো বলেন, আধুনিকতার ছোয়ায় এ পেশার লোকজন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। তবে বাপ দাদার পৈতিক পেশার কারনে অনেক বহু কষ্টে টিকে আছে। তবে সরকারি পৃষ্টপোষকতায় এ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজনকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তা না হলে অচিরেই হাড়িয়ে যাবে এ পেশার সাথে জড়িত লোকজন।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি এবং হাট ইজারাদার মোঃ ইকরামূল ইসলাম খবির ও আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক গৌরাঙ্গ কুমার ঘোষ জানান, নৌকা হাটের সাথে ঘিওরের সুনাম এবং ঐতিহ্য জড়িত আছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ঘিওর হাটে নৌকা কিনতে আসে। হাটে বিভিন্ন ধরনের নৌকা বিক্রিয় হয়। অতিরিক্ত কোন ধরনের খরচ না থাকায় ক্রেতা বিক্রেতারা নিরাপদে নৌকার ব্যবসা করে থাকেন। একজন ব্যবসায়ী ১৫/২০টি নৌকা বিক্রি করে থাকে। তবে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটটি নদী ভাঙ্গনের কারনে সুনাম ও ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসে সামাজিক নিরাপত্তা মেনে নৌকার হাটে কেনা বেচা চলে।
বাজার কমিটির সাধারন সম্পাদক আব্দুল মতীন মুসা জানান, শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাট নৌকা বিক্রির জন্য বিখ্যাত। প্রতিবছর বন্যা মৌসুমে হাজার হাজার নৌকা এই হাটে বিক্রি হয়। ক্রেতা এবং বিক্রেতারা সুন্দর পরিবেশে হাটে নৌকা বিক্রি করে থাকেন। তবে বাজার কমিটির উদ্যোগে আমরা প্রতি বছর শুষ্ট মনিটরিং করে থাকি। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার নৌকা আমদানি বেশি হবার কারনে বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ অহিদুল ইসলাম টুটুল জানান, বাংলাদেশের মধ্যে সব চেয়ে বড় হাট ঘিওর। শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী হাটটির জৌলস আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। শুধু নৌকা নয়, আমাদের এই হাটে বাঁশ, বেত ও মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর হাট বসে। প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ঘিওর হাট। এলাকার অভিঞ্জ মহল ও শুশিল সমাজের প্রতিনিধিগন ঘিওর হাটের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য এবং বাজারের উন্নয়ন কল্পে উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

সম্প্রতি সংবাদ