দৌলতদিয়া যৌন কর্মীদের সেকাল আর একাল

editor ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

আবুল হোসেন , গোয়ালন্দ ( রাজবাড়ী ) প্রতিনিধি :২১ জুলাই-২০২০,রবিবার।

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় দেশের বৃহত্তম যৌন পল্লীর যৌন কর্মীদের যারা এক সময় আরাম আয়েশ করে দিন কাটিয়েছেন । রুপ চেহারায় টগবগে দৃষ্টি নন্দন ছিলো , খরিদ্দারদের দৃষ্টি তে যাদের নজর কেড়েছে, আজ জীবন যুদ্ধে পরাজয় বরন করে তারা আজ কেও ভিক্ষা করছে , কেও অন্যের ঘরে রাধুনির কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন । হা বলছি সেই কাকলি, রুপালী , সোনিয়া ,রত্নাদের কথা ( ছদ্ধ নাম )
অনুসন্ধানে দেখা যায় , আশির দশকে গোয়ালন্দ ঘাট ( পুরাতন গোয়ালন্দ ) ছিলো এ যৌন পল্লী , সেখান থেকে আগুন দিয়ে ঘর বাড়ী পুড়িয়ে উচ্ছেদ করে দিলে তারা চলে আসে দৌলতদিয়া ঘাটে । পদ্মা নদীর কোল ঘেষে রেল ওয়ে ষ্টেশনের পূর্ব পাশে গড়ে উঠে এই যৌন পল্লী । দুর্বৃত্তরা কয়েক বার তাদের পাট খড়ির ছাপড়া ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলেও তারা আজ ওখানে গড়ে তুলেছে পাকা ঘর , কেও কেও নির্মান করেছে বহুতল ভবন । এক সময় যৌন পল্লীর কেও মারা গেলে কলসি তে রশি বেধে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো অথবা পদ্মা নদীর চরে চাপা মাটি দেওয়া হতো । আজ পল্লীর পাশেই হয়েছে তাদের কবর স্থান। সেখানেই তাদের সমাহিত করা হয় । মৃত্যে যৌন কর্মীরদের জানাজা নিয়ে এখনও চলছে বহু ফতুয়া । স্থানীয় কোন ইমাম বা মাওলানা তাদের জানাযা নামাজে ইমামতি করতে চায়না । তবে তাদের রয়েছে ভোটের অধিকার সংসদ নির্বাচন সহ যে কোন নির্বাচনে তারা ভোট প্রদান করে । সেখানে চলে ভোটের ক্যাম্পিং , পক্ষ নেয় পছন্দের দল বা প্রার্থীর । পরাজিত সমর্থকরা নির্যাতিত হয় বিজয়ী সমর্থকদের হাতে । এমন কি রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অনেক যৌন কর্মী মিথ্যা মামলায় জেল খেটে হয়রানির শিকার হয়ে বাড়ী ঘর ছেড়ে বা বিক্রি করে রাতের অন্ধকারে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে । তাদের বাড়ী ঘর প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায় । কেও কেও মিথ্যা ভালোবাসার ছলনায় পড়ে বাড়ীওয়ালাদের কাছে নি:শ্ব হয়ে খালি হাতে জীবন কাটাচ্ছে । আবার অনেকেই সুদ খোরদের নিকট থেকে টাকা নিয়ে সুদের টাকা না দিতে পেরে সুদে আসলে বাড়ী ঘর ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। নেশায় মগ্ধ হয়ে অনেক জীবন প্রদীব অকালে ঝড়ে গেছে । যৌন পল্লীতে রয়েছে অনেক রহস্য ঘেরা মৃতে্যু , আইন শৃঙ্খলা বাহিনির তদন্ত রির্পোট পেতে সময় চলে যায় বছরের পর বছর ।

 

 


সরেজমিনে দৌলতদিযা পতিতালয়ের পাশে পুড়া ভিটায় এলাকায় গিয়ে দেখা যায় , জীবন যন্ত্রনা দু:খ আর বেদনা নিয়ে চলছে বয়সের ভারে অসহায় এক সময়ের যৌন কর্মীদের সংসার। তারা কেও লঞ্চ ও ফেরি ঘাট থেকে ভিক্ষা করে ফিরছে , আবার কেও যৌন পল্লীর মধ্যে রাধুনির কাজ করে খাবার নিয়ে আসছে । কেও বা অন্যের কাপড় ধুয়ার কাজ করছে । অসুস্থ্যরা বিছানায় শুয়ে কান্না কাটি করছে । এ ভাবেই জীবন কাটছে এক সময়ের রুপসিদের । তারা আজ অন্ধকার গলি থেকে বেড়িয়ে এসেছে ঠিকই , তবে যৌবনে টাকা পয়সার অভাব না বুঝলেও বয়সের ভারে আজ পেটের ক্ষুদা মেটাতে দ্বারে দ্বারে কাজ বা ভিক্ষা করে চলছে তাদের জীবন । অনেকেরই ছেলে মেয়ে থাকলেও বড় হয়ে তাদের খোজ খবর রাখেনা । পিতৃ পরিচয় না দিতে পারার কারনে কেও কেও আর গ্রামের বাড়ীতে ফিরে যেতে পারে নাই । সন্তানহীনদের বেদনা আরো কষ্টের, তাদের মৃতে্যুর পরে সৎকার টা কে করবে তা নিয়ে তাদের মানষিক যন্ত্রনা শেষ হবার না ।
সোনিয়া ( ছদ্ধনাম ) কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন , ছোট বেলায় ভাতের অভাবে বাড়ী থেকে কাজের জন্য শহরে এসেছিলাম , আমার এক আত্নীয় দালালদে খপ্পরে পড়ে যশোরের এক বাড়ীওয়ালীর নিকট বিক্রি করে দেয় , সেখান থেকে আজ পর্যন্ত এই অন্ধকার গলি থেকে বেড়িয়ে আসতে পারি নাই । জীবনের কষ্টার্জিত টাকা এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে শেষ হয়ে গেছে , সন্তানের পিতার পরিচয়টুকু নিয়ে সমাজে ফিরে যেতে পারি নাই ।
রত্না ( ছদ্ধ নাম ) বলেন , চাকুরির প্রলোভনে উত্তর অঞ্চলের এক পতিতালয়ে আসি , টাকা পয়সা ধরে রাখতে পারি নাই ,মা বাবা মারা গেছে , ভাইয়েরা খোজ খবর রাখেনা । কোন সন্তান না থাকায় অসুস্থ্য হলে দেখার কেও নাই । বৃদ্ধ বয়সে রাধুনির কাজ করে খাই ।
গোয়ালন্দ উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার চন্দন কুমার মিত্র বলেন , যৌন কর্মীদের জন্য কোন বিশেষ বরাদ্দ নেই , তবে বর্তমানে বৃদ্ধদের জন্য অল্প কিছু বয়স্ক ভাতা চালু করেছি ।
যৌন কর্মীদের সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতি ( এম, এস , এস ) নির্বাহী পরিচালক মোছ .মর্জিনা বেগম বলেন বৃদ্ধ অসহায় যৌন কর্মীদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম হলে এদের কে পুর্নবাসন করা যেতো । অথবা কারিগরি শিক্ষার মাধ্যেমে হাতের কাজ শিখিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে সমাজে এরা অবহেলয় থাকতো না ।

সম্প্রতি সংবাদ