ব্রেকিং নিউজ

বিডিআরের ঘটনার সত্যটা একদিন বের হবে: প্রধানমন্ত্রী

editor ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ breaking slider-top প্রধান খবর

কালের কাগজ ডেস্ক ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০,

বিডিআরের ঘটনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকারে থেকে আমরা এমন একটা ঘটনা ঘটাবো তা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। যারা ক্ষমতায় আসতে পারে নাই তারাই তাদের পেছনে ছিল। তাদের সঙ্গে ছিল ওয়ান-ইলেভেন যারা সৃষ্টি করেছিল তারা। আওয়ামী লীগ মেজরিটি ক্ষমতায় আসার সবকিছুকে নস্যাৎ করার পরিকল্পনায় তারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। একদিন না একদিন এই সত্যটা বের হবে।’

রোববার জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিডিআর বিদ্রোহের সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের সাহসী ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে বিডিআর বিদ্রোহের বিষয়টি টানেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সাহারা খাতুনের সাহস দেখেছি বিডিআরের ঘটনার সময়। সাহারা আপা ঝুঁকি নিয়ে সেখানে গিয়েছেন। রাতের বেলা সেখানে গিয়ে বিডিআর সদস্যদের আর্মড সারেন্ডার করিয়েছেন। অনেক আর্মি অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন। এজন্য তার জীবনের ওপরও হুমকি এসেছিল। এরকম অবস্থায় তিনি দুঃসাহসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। কোনও সাধারণ মানুষ এই সাহস করতে পারতো না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি সততার সঙ্গে কাজ করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার গঠনের ৫২ দিনের মাথায় এই ঘটনা ঘটলো। ওই ঘটনায় যে ৩৩ জন সেনা অফিসার মারা যান তারা আওয়ামী লীগ পরিবারের। বিডিআরের ডিজি ছিলেন লুৎফুল হাই সাচ্চুর আপন চাচাত ভাই। ঘটনার পরে আমাদের চেষ্টা ছিল কোনও মতে এটাকে থামানো। অফিসার ও তাদের পরিবারগুলোকে রক্ষা করা। ওই সময় আমরা সেনাবাহিনী নিয়োগ করার পর তাদের (বিদ্রোহীদের) গুলিতে কয়েকজন সেনা সদস্য মারা গেলেন। বিডিআরের ওই ঘটনাটি ছিল অস্বাভাবিক ঘটনা। ঘটনার আগেরদিন আমরা গেলাম। একটা ভালো পরিবেশ। পরের দিন এই ঘটনা ঘটলো- এর পেছনে কারা আছে? আমরা তো কেবল সরকার গঠন করেছি। এটা কোনোদিনই যুক্তিযুক্ত নয়। সরকার গঠনের পর আমরা এমন একটা ঘটনা কেন ঘটাবো দেশে একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়? কাজেই যারা তখন ক্ষমতায় আসতে পারে নাই তারাই তাদের পেছনে ছিল। একদিন না একদিন এই সত্যটা বের হবে।’

বিএনপি-জামাতের মিথ্যা বলার একটা আর্ট আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর তারা ব্যাপক প্রচার করে ফেলেছিল আমি নাকি নিজেই গ্রেনেড নিয়ে নিজেই মেরেছি। বিডিআরের ঘটনার পরও তারা এভাবে অপপ্রচার শুরু করেছিল।’

সাহারা খাতুনকে স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক আন্দোলন সংগ্রামে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতেন। কোনও ভয়ভীতি তার ছিল না। তার ওপর যে অত্যাচার জুলুম হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এরশাদ সাহেব যখন ক্ষমতায় তখন তার ওপর লাঠির বাড়ি, তাকে পিটিয়ে ডাস্টবিনে পর্যন্ত ফেলে দিয়েছে। এরপর খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আসার পরও একই অত্যাচার। একদিকে পুলিশ বাহিনী, আরেকদিকে ছাত্রদলের ক্যাডার বাহিনী। তাদের অত্যাচারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কেউই বাদ যেত না। একদিনে অত্যাচার আর অন্যদিকে মামলা মোকাদ্দমা চলতো।’

ওয়ান ইলেভেনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালে যখন আমাকে গ্রেফতার করা হয় এবং একের পর এক মামলা দেওয়া হয়। বিএনপি আমার বিরুদ্ধে ১২টি মামলা দিয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক আসার পর আরও ৫-৬টি মামলা দেওয়া হয়। তাদের প্রচেষ্টা ছিল মামলাগুলো দ্রুত চালিয়ে আমাকে শাস্তি দিয়ে দেবে। বলতে গেলে একদিন পরপর আমাকে কোর্টে হাজিরা দিতে নেয়া হতো। আর ওই মামলার সময় সাহারা আপা সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকতেন। মামলা পরিচালনা করতে আমাদের আইনজীবীরা এলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করতো, গ্রেফতার করতো। তাদের ছাড়িয়ে আনতে ছুটে যেতেন সাহারা আপা। এভাবে তার সাহসী ভূমিকা আমরা দেখেছি।’

দলের আরেক প্রয়াত সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলমকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘এত অল্প সময়ে চলে যাবেন বুঝতে পারি নাই। তার করোনা হওয়ার পর ভালো হয়েছিল। তার কিডনির সমস্যা ছিল, কিন্তু সে কিছু মানেনি। যখন একটু সুস্থ হলো, চলে গেলেন এলাকায়। এভাবে করোনার সময় আমরা আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মী হারিয়েছি। মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়েই কিন্তু তারা জীবন দিয়েছেন। ইসরাফিলের ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে।’

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পাশে ছিলেন। পচাঁত্তরে আমাদের পাশে ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আমি বন্দি থাকাকালে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বব্যাংখ যখন পদ্মা সেতু নিয়ে আমার ওপর দোষ চাপালো তখনও তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করেছেন। তিনি সব সময় বাংলাদেশের মানুষের পাশে ছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ কামনা করতেন।’

জাতির পিতা হত্যার পর প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থানের সময়ের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পঁচাত্তরের পর আমাকে ভারতে রিফিউজি হিসেবে থাকতে হয়েছে। নিজেদের নাম পর্যন্ত আমরা ব্যবহার করতে পারতাম না। কারণ নিরাপত্তার কারণে আমাদের ভিন্ন নামে থাকতে হতো। আমরা দুই বোন একেবারে নিঃস্ব, রিক্ত অবস্থায় ওখানে (ভারতে) থাকতাম। পারিবারিক পরিবেশের একটু স্বাদ পাওয়া যেত প্রণব বাবু এবং তার পরিবারের কাছ থেকে। আর তার ধারাবাহিকতা আমৃত্যু বজায় ছিল। তারমতো একজন জ্ঞানী রাজনীতিবিদ পাওয়া খুবই মুশকিল। তিনি কংগ্রেসের হলে সব দলই তাকে সম্মাণ করে। তার মৃত্যু উপমহাদেশের রাজনীতিতে বিরল শূন্যতা তৈরি হলো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শোকপ্রস্তাবে এত পরিচিত মানুষ সবার কথা বলতে গেলে সময় লাগবে। মৃত্যু- এটাই সত্য। জšি§লে মরিতেই হবে। মৃত্যু মানেই দুঃখ-কষ্ট। আমরা সেই দুঃখ বয়েই চলছি। একের পর এক বহু সংসদ সদস্যকে আমরা হারাচ্ছি। প্রতিবারই আমাদের শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে করোনাভাইরাস আসার পর এটা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জে বিস্ফোরণের কারণ বের হবে: নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা সেখানে গেছেন, নমুনা সংগ্রহ করছেন। ওই ঘটনা কেন ঘটলো, কীভাবে ঘটছে সেই ব্যাপারে তদন্ত হচ্ছে। আমি মনে করি এটি বের হবে।’ নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে শেখ হাসিনা মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। আর আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনার জন্য দোয়া করার কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বার্ন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছেন। প্রতিনিয়ত তিনি আমাকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন। রোগীদের অবস্থা জানাচ্ছেন। অনেকজন এ পর্যন্ত মারা গেছেন। বাকি যারা তাদের অবস্থাও এতই খারাপ। তারপরও চিকিৎসার সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নামাজ পড়া অবস্থায় মসজিদে এ ধরনের বিস্ফোরণ খুবই দুঃখজনক ঘটনা। ওইটুকু একটা জায়গায় ৬টা এসি লাগানো। আবার শোনা যাচ্ছে গ্যাসের লাইনের ওপরেই নাকি এই মসজিদটা নির্মাণ করা হয়েছে। সাধারণত যেখানে গ্যাসের পাইপলাইন থাকে সেখানে নির্মাণ কাজ হয় না। জানি না এটা কতটা সত্য। জানি না রাজউক থেকে এটার পারমিশন দিয়েছে কিনা। কারণ এখানে পারমিশন তো দিতে পারে না, দেওয়া উচিত নয়। এতে সব সময় আশঙ্কার ব্যাপার থাকে। সেটাই এখন তদন্ত করে দেখা হবে।’

সকলেই মসজিদে দান করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজকাল সবার পয়সাও আছে। এয়ারকন্ডিশনও দিয়েছে। সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহটা, কতটা লোড নিতে পারবে সেই ক্যাপাসিটি ছিল কিনা, সার্কিট ব্রেকার ছিল কিনা সব বিষয় কিন্তু দেখতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে কিছু করতে গেলে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

এ ঘটনায় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বলেছি। অন্য সবার কাছে আমার নির্দেশ গেছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। এর কারণটা খুঁজে বের করা। এছাড়া সারাদেশের অন্যান্য মসজিদে যারা অপরিকল্পিতভাবে ইচ্ছামতো এয়ারকন্ডিশন লাগাচ্ছেন বা যেখানে সেখানে একটি মসজিদ গড়ে তুলছেন, সেটা একটা স্থাপনা করার আদৌ জায়গা কিনা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়েছে কিনা, নকশা করা হয়েছে কিনা সেই বিষয়গুলো দেখা একান্ত প্রয়োজন। না হলে এ ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনা যেকোনও সময়ে ঘটতে পারে।

সম্প্রতি সংবাদ