ব্রেকিং নিউজ

নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ

editor ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ breaking midslider slider-top প্রধান খবর

কালের কাগজ ডেস্ক:২৩ অক্টোবর ২০২০,

মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরের সব চালককে এই টেস্টের আওতায় আনার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘যারা গাড়ি চালাচ্ছে, তারা মাদক সেবন করে কিনা সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজরে রাখতে হবে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২০ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ এবং চালকের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দেশে ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে নাগরিক সচেতনতাটা আমাদের খুব বেশি প্রয়োজন।’ দুর্ঘটনা ঘটলেই আইন হাতে তুলে নেয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। চালককে সব দোষ দিয়ে তাকে প্রহার করে মেরে ফেলা, আইন হাতে তুলে নেয়ার যে সংস্কৃতি দেশে আছে তা সবাইকে ত্যাগ করতে হবে।’ সবার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন মেনে চলার আহ্বান ও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। টানা চতুর্থবারের মতো এ বছর দেশে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এবারের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মুজিববর্ষের শপথ, সড়ক করব নিরাপদ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। ড্রাইভারদের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া, লাইসেন্স দেয়ার সময় ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, সত্যিই সে ভালো ড্রাইভিং জানে কিনা। টাকা দিয়ে যাতে কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে না পারে, সেটা দেখতে হবে।’ তিনি বলেন, অনেক সময় ড্রাইভার হেলপারের কাছে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম করতে চায়, তারপরই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় দেখা যায় ড্রাইভার এত ক্লান্ত থাকে যে, সে ঘুমিয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনা ঘটে। ‘যারা হেলপারের কাজ করেন আমি মনে করি, তাদেরও একটু প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদেরও যেন গাড়ি সম্পর্কে এবং গাড়ি চালনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ থাকে। পাশাপাশি, গাড়ির ফিটনেস বজায় রাখাটাও খুব দরকার।’ গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষাটা যেন নিয়মিত হয়, সেজন্য যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি চালকদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাইভেট সেক্টর বা গভর্নমেন্ট সেক্টরের সবাইকে বলব, আপনারা যদি এভাবে করতে পারেন- এতটা সময় বা দূরত্ব একজন ড্রাইভার চালাবে, তারপর তার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে অলটারনেটিভ ড্রাইভারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা কমে যাবে।’

প্রাইভেট গাড়ি চালনার ক্ষেত্রেও তিনি নির্দিষ্ট সময়ের পর চালকের বিশ্রাম এবং আহারের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন এবং তার সরকার পর্যায়ক্রমে সব সড়কের (মহাসড়ক) পাশে বিশ্রামাগার নির্মাণ করবে বলেও উল্লেখ করেন। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে চালকদের জন্য বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে সরকার এবং অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির আবেদন গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ‘এই ড্রাইভিং শিক্ষাটাকে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। অনলাইনেও শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস রোধে সবাইকেই স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়ম মেনে চলতে হবে। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহারের তাগিদ দেন। সিনেথেটিকের পরিবর্তে স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সহজলভ্য বিবেচনায় কাপড়ের মাস্ক ব্যবহারেরই পরামর্শ দেন তিনি। তিনি গাড়ি চালানোর সময় চালকদেরও মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান জানান।

ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকার জন্য চালকদের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘চালকদের মধ্যে ওভারটেক করার প্রবণতা আছে । একটা গাড়ি সামনে চলে গেছে এটা দেখে বেহুঁশ হয়ে সেই গাড়িটি ওভারটেক করতে গিয়েই কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটায়। এই প্রবণতাটাও বন্ধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘গাড়িচালকদের নির্দিষ্ট গতিসীমা ও আইন মেনে নিরাপদে যানবাহন চালাতে হবে।’ তিনি ওভারটেকিং এবং ওভার স্পিড প্রতিরোধে সড়ক-মহাসড়কে স্পিডো মিটার লাগানোর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চিন্তাভাবনার পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়ক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে তার সরকার দেশের ২১টি স্থানে একমুখী ও উভয়মুখী মিলে মোট ২৮টি ‘এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, আমাদের পথচারীদের মধ্যে নাগরিক সচেতনতার খুব অভাব। আমরা মুখে খুব বলেটলে যাই কিন্তু কাজের বেলায় দেখি পাশেই ফুটওভার ব্রিজ অথচ রাস্তার মধ্যখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। একটা গাড়ি আসছে অথচ হাত দেখিয়েই অমনি হাঁটা দিল। কোথাও দেখা যাচ্ছে, বাবা বাচ্চা কোলে নিয়ে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তার বেড়া দেয়া ডিভাইডার অবৈধভাবে অতিক্রম করছে। তিনি বলেন, গাড়িটা একটা যন্ত্র কাজেই ব্রেক কষলেও থামতে একটু সময় লেগে যায়। হাত দেখালেই থেমে যেতে পারে না।’ এ বিষয়েও পথচারী, চালকসহ সবাইকে সচেতন করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ প্রদান করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, যেখানে সেখানে রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে হবে এবং ট্রাফিক রুলস সবাইকে মেনে চলতে হবে।’ ‘ট্রাফিক আইন মেনে চলা এটা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে স্কুল পর্যায়ের প্রত্যেক জায়গাতেই এই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া দরকার।’

সারা দেশে সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় তার সরকারের প্রচেষ্টার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের চৌম্বক অংশ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ‘ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৭ থেকে ২০২০ প্রণয়ন করেছে। তিনি বলেন, তার সরকার ‘এসডিজি’র রোড-সেফটি সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ‘এসডিজি অ্যাকশন প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করছে। তার সরকারের ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন’, ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮,’র বাস্তবায়নের উদ্যোগ, ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান এবং ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ৬৪ জেলায় ‘ ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) স্থাপন করছে।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সারা দেশের মহাসড়কে ১৪৪টি ব্ল্যাকস্পট চিহ্নিত করে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান ও বাজার এলাকায় রোড ডিভাইডার স্থাপনসহ বাঁক সরলীকরণ, রোড মার্কিং, সাইন-সিগন্যাল ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ২২টি মহাসড়কে সব ধরনের থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা দেশ ধ্বংস এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতির জন্য বিএনপি-জামায়াত সরকারেরও এ সময় কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তার সরকার ’৯৬ সালে সরকারে এসেই বিআরটিসি’র জন্য ১ হাজার নতুন বাস কিনেছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর সেগুলোর আর হদিস মেলেনি।

তিনি বলেন, ‘আবার বিআরটিসি’র জন্য নতুন বাস কেনা হলেও বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার হয়ে ৬শ’ বিআরটিসি বাস, ট্রাক এবং প্রাইভেট কারসহ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার যানবাহন ধ্বংস হয়। তিনি বলেন, মানুষের সুবিধার জন্য আমরা কষ্ট করে কিনে আনি আর তারা সেগুলো ধ্বংস করে আন্দোলনের নামে, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে।’

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সড়ক এবং জনপথ বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাগত বক্তৃতা করেন। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মো. একাব্বর হোসেন এবং বেনজীর আহমেদ এমপি সংযুক্ত ছিলেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর বনানীর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ভবন মিলনায়তনে মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এবং ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি স্থানে বড় পর্দার মাধ্যমে গাড়ি মাালিক এবং চালকরা এই ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানটি দেখেন।

কৃষি উৎপাদন ও মজুদ বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত : এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সকালে গণভবনে কৃষি উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বন্যা পরিস্থিতিতে বিশেষ করে সামনের আমন মৌসুম নিয়ে পর্যালোচনা হয়। কোভিড-১৯ এর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। সভায় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক. খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, অর্থ সচিব (সিনিয়র) আবদুর রউফ তালুকদার, কৃষি সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম, খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

সম্প্রতি সংবাদ