ব্রেকিং নিউজ

ঘিওরে নদী খননের বালু ফেলা হচ্ছে কৃষি জমিতে, ড্রেজিংয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে নদীর পাড়

editor ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:১১ নভেম্বর-২০২০,বুধবার।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা ধলেশ^রী নদীতে খননকৃত বালু ডাম্পিং করা হচ্ছে কৃষি জমিতে। আর সেই বালুর সঙ্গে আসা পানি ও বালু আশেপাশে কৃষিজমিতে গিয়ে পড়েছে। এতে ওইসব জমিতে চলতি রবি শস্য আবাদে অনিশ্চিতয়তা দেখা দিয়েছে। শক্তিশালী খননযন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন করায় নদীর পাড় যেমন ভাঙ্গছে তেমনি ইতিমধ্যে পাকা সড়কের বেশকিছু অংশ নদীতে চলেগেছে। স্থানীয় লোকজনদের অভিযোগ নদী খননে তাদের উপকার থেকে এখন অপকারই বেশী হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনও স্বীকার করেছেন নদী ভাঙ্গন ও কৃষককের ক্ষতির কথা।

 

মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঘিওর উপজেলার পূর্বঘিওর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে শক্তিশালী খননযন্ত্র দিয়ে বালু তুলে তা প্রায় আধা কিলোমিটার দ‚রে কয়েক একর ফসলিজমিতে ফেলা হয়েছে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে ফলে ডাম্পিং স্পর্ট ছাড়িয়ে বালু ও পানি আশে পাশে কৃষিজমিতে গিয়ে পড়ছে। শুধু কৃষি জমিতেই বালু যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে পূর্বঘিওর চকের পানি নামার খালটিও বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে চলতি বছর রবিশস্য আবাদ নিয়ে শংকায় পড়েছে স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলা প্রশাসন এবং বিআইডবিøউটিএ স‚ত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় জেলা সদরের পুটাইল থেকে ঘিওর উপজেলা সদর পর্যন্ত কালীগঙ্গা ও ধলেশ^রী নদীর প্রায় ৩০ কিলোমিটার খনন করা হচ্ছে। ১৯ লাখ ঘনমিটার বালু অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিøউটিএ) তত্ত¡াবধানে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় ঘিওর প‚র্ব পাড়া গ্রামের জ্যোতি খোন্দকার, আলিম খোন্দকার ও তসলিম মোল্লার ৩৫০ শতক ওই কৃষিজমিতে এসব বালু ফেলা হয়েছে। চার ফুট উঁচু করে ওই জমি ভরাট করে দেওয়ার শর্তে সেখানে বালু ফেলার চুক্তি করেছে জমির মালিকেরা। তবে এসব বালু ও বালু সঙ্গে আসা পানি আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ২০ থেকে ২৫ একর কৃষিজমিতে বালু ভরাট ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। স্তুপ করে রাখা বালু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যত্র বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
পূর্ব ঘিওর গ্রামের চান মিয়া জানান, প্রথমে জানানো হয়েছিল স্থানীয় কবরস্থানের ১৬ শতাংশ জমিতে মাটি ফেলে উচু করা হবে। এর পর দেখা গেলো পাশে জ্যোতি খোন্দকারদের জমিতে মাটি ফেলা হচ্ছে। কয়েক দফা ডাম্পিং স্পর্টের বাঁধ ভেঙ্গে বালু ও পানি তাদের কৃষিজমিতে গিয়ে পড়েছে। এখন ওই সব জমিতে সহজেই আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাঁধা দিতে গিয়ে উল্টো সরকারি কাজে বাঁধা দেওয়া হচ্ছে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
ডাম্পিং স্পর্টের পাশে ৬৪ শতাংশ জমির মালিক ফায়জুদ্দিন, তার ছেলে রনি জানান ডাম্পিং স্পর্টের বালুতে তাদের জমির ৯০ ভাগ বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। বালু সরিয়ে ফেলা না হলে কোনো ফসল আবাদ করা সম্ভব নয়। তাঁরা শুরু থেকেই সেখানে ডাম্পিং না করতে বাধা দিয়ে আসছেন কিন্তু কোন বাঁধাই মানছে না ।
যেখানে বালু ফেলা হচ্ছে তার পাশেই স্থানীয় সিদ্দিক শেখের ৫০ শতক জমি রয়েছে। ওই জমিতেও বালু ও পানি পড়ে আবাদ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সরিষা আবাদের জন্য দুই-এক দিনের মধ্যে জমি প্রস্তুতির কথা ছিল তার।
কৃষিজমিতে ডাম্পিং স্পর্ট করায় আশেপাশে জমিতে বালু ও পানি জমায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন স্থানীয কৃষকরা। এদের আশংকা অনেকই চলতি রবিশস্য আবাদ করতে পারবেন না।

জ্যোতি খোন্দকারের ছেলে রাকিব খোন্দকার বলেন, ডাম্পিং স্পর্ট করার জন্য প্রথমে তারা জমি দিতে রাজি ছিল না। তবে শর্ত অনুযায়ী তাদের জমিতে যে বালু ফেলা হবে রাস্তার লেবেল বালু রেখে বাকী বালু প্রশাসন বিক্রি করে দিবে। এতে তাদের জমিটি ভরাট হয়ে যাবে। এই ধরণে প্রস্তাবে জমিটি ডাম্পিং স্পর্ট করার জন্য একছরের জন্য ভাড়া দিয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন মাঝে মধ্যে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়াতে অন্যের জমিতে বালু চলে যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়া এসব বালু অপসারণ করা হবে।
বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ঘিওর সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ওহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় ঘিওর প‚র্ব পাড়া কবরস্থান এবং পাশের রাস্তায় এসব বালু ফেলার কথা ছিল। তবে পরে এসব বালু কয়েকজন মালিকের জমিতে ফেলা হয়। এসব বালু আশপাশের কৃষি জমিতে ছড়িয়ে যাওয়ায় ভ‚ক্তভোগী কৃষকেরা বাধা দেন। এরপর সেখানে বালু ফেলা বন্ধ রাখা রয়েছে।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইরিন আক্তার বলেন, নদীর পাড়ে বালু রাখার মতো জায়গা না থাকায় কোনো কৃষিজমির ক্ষতি না হওয়ার শর্তে সেখানে ফেলা হয়। দ্রæত সময়ের মধ্যে কৃষিজমি থেকে বালু অপসারণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ক্ষতিপ‚রণ দিতে জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বালু ফেলতে অন্যত্র স্থানও দেখা হচ্ছে। এছাড়া তিনি স্বীকার করেন স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন ড্রেজিং করা ফলে নদীর পার ভেঙ্গে পড়েছে।
নদী খনন কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআইডবিøউটিএ’র উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, চারপাশে বাঁধ দিয়ে মাঝখানে বালু ফেলার ব্যবস্থা করা হলেও কিছু বালু আশপাশে কৃষিজমিতে পড়েছে। খোলা নিলামের মাধ্যমে বালু বিক্রির সময় ওইসব জমি থেকে বালু অপসারণ করা হবে। প্রকল্পে ক্ষতিপুরনে বিধান নেই তবে ভ‚ক্তভোগী কৃষকদের ক্ষতিপ‚রণের ব্যবস্থা করা হবে।

সম্প্রতি সংবাদ