ব্রেকিং নিউজ

জাতির বিজয় দিবস কাল

editor ১৩ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ breaking slider-top প্রধান খবর

কালের কাগজ  ডেস্ক:১৫ ডিসেম্বর, ২০২০

‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে / বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা / আমরা তোমাদের ভুলব না / দুঃসহ এ বেদনার কণ্টক পথ বেয়ে / শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা / আমরা তোমাদের ভুলব না।’ … কাল ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। বীরের জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মপ্রকাশের দিন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তিকামী যে বীরযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বিজয়ের রাঙা সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল তাদের স্মরণ করার দিন।

তাই সারা দেশের মানুষ ও প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানোর শোক বুকে চেপে এ দিনটি পালন করবে আনন্দ-উৎসবে। দেশের স্বাধীনতার জন্য যে অকুতোভয় বীর সন্তানেরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, কৃতজ্ঞ জাতি গভীর বেদনা ও পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সেই মৃত্যুঞ্জয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র, নিরপরাধ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। বর্বর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল তারা। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে সেই রাতেই তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। তবে তার আগেই তিনি বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বার্তা দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণায় তিনি বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।

দেশের বীর সন্তানেরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বান সাড়া দিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ সংগ্রামে আত্মনিবেদন করেন। দীর্ঘ ৯ মাস সংগ্রামের পর ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম ও সহায়-সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে বাঙালি। ১৯৭১ সালের এই দিনে রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করেছিল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। লাল-সবুজ পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বিজয়ী বাঙালিরা। সেই পতাকা উঁচিয়ে চলছে প্রগতির পথে বাঙালির অভিযাত্রা।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে কাল (বুধবার) সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে অগণিত মানুষ নিবেদন করবে পুষ্পাঞ্জলি। রাজধানীসহ সারা দেশেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেবে বিজয় উৎসবে।

দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তারা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন।

১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি সরকার এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশের বিজয়ের এই দিনকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। ওই বছর থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিবসটি পালন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এ দিনটিকে ছুটি ঘোষণা করা হয়। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন; সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা ও অন্যান্য পতাকায় সজ্জিত করা হবে। যদিও করোনা মহামারির কারণে এবারের বিজয় দিবস উদযাপিত হচ্ছে কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আজকের দিনে নতুন করে ফের বিজয় উল্লাসে ভাসবে দেশ, আনন্দে উদ্বেলিত হবে জাতি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে ছড়াবে বিজয়ের আনন্দ।

বুধবার ভোরে ঢাকার তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দর এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের অনুষ্ঠানমালার সূচনা ঘটবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি ক‚টনীতিকরা ফুল দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করবে। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ ও জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক পোস্টার প্রদর্শনী হবে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অল্প সংখ্যক দর্শনার্থীকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে। এছাড়া মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা জানানো হবে।

মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন এবং দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘরগুলো বিনা টিকিটে প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সশস্ত্র বাহিনীর সম্মিলিত সামরিক কুচকাওয়াজ (প্যারেড) হবে না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে গত নভেম্বর মাসের শেষভাগে এক ভার্চুয়াল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচি:মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সূর্যোদয়ক্ষণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী সংগঠনের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এদিন সকাল ৯টায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করবেন দলের নেতাকর্মীরা। সকাল সাড়ে ৯টায় টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল; সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বিকাল সাড়ে ৩টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সীমিত পরিসরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখবেন ।

বিএনপির কর্মসূচি :মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। এদিন ভোরে নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল সাড়ে ৮টায় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির উদ্যোগে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে ফিরে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে শেরেবাংলা নগরস্থ দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। বিকাল সাড়ে ৩টায় বিএনপির উদ্যোগে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আলোচনা সভায় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৬ ডিসেম্বর ভোরে দেশব্যাপী বিএনপির কার্যালয়গুলোতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বিজয় দিবসের তাৎপর্য উল্লেখ করে স্থানীয় সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভা করার কথা বলা হয়েছে।

জাতীয় পার্টির কর্মসূচি :বিজয় দিবসে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এদিন সকাল ৬টায় জাতীয় পার্টি বনানী কার্যালয় থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা করবে। সকাল ৭টায় পার্টির চেয়ারম্যান দলীয় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বেলা ১১টায় জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয় মিলনায়তনে জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টি আয়োজিত মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিকাল ৩টায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পার্টি আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সম্প্রতি সংবাদ