ঘিওরে মুক্তিযোদ্ধা টাইগার লোকমানের সময় কাটে নিজের তৈরি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষন কেন্দ্রে

editor ৬ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

রামপ্রসাদ সরকার দীপু ,স্টাফ রিপোটার-২০২১,বুধবার।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার আশাপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা টাইগার লোকমান জন্ম গ্রহন করেন। ১৯৭১’ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২২/২৩ বছর। সে দিনের টগবগে বাঙ্গালী যুবক লোকমান ১৯৬৭ সালে যোগ দিয়ে ছিলেন পাকিস্থানী সেনা বাহিনীতে। সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার পরে তিনি বুঝতে পারেন বাঙ্গালীদের নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। পাকিস্থানীদের হাতে চরম নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে বাঙ্গালীরা। মনের ভীতরে চাপা ক্ষোভ নিয়ে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। নৌকা চালিয়ে, মাছ ধরে, রাজমিস্ত্রি কাজ করে আবার কখনও ঘেটু যাত্রা করে সংসার চালাতে হয়েছে। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তিনি কার কাছে আর্থিক সহযোগিতা চায়নি। অভাব অনটনের মধ্যে কাটাতে হয়েছে প্রতিটি দিন। গ্রামের সহজ সরল গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে পাকিস্থানী দালাল, রাজাকাররা নির্বিচারে নির্যাতন, অত্যাচার চালাচ্ছে। গ্রামের যুবতি নারীদের ধরে নিয়ে শাররীক নির্যাতন, ধর্ষন করা করছে পাকিস্থানীরা। দলে দলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে গ্রামের মানুষ। এ সমস্ত দৃশ্য দেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য গোপনে গোপনে এলাকার যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। এক পর্যায়ে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষন শোনার পরে ঠিক করলেন মুক্তিযুদ্ধে যাবার। নিজেদের অধিকার আদায় করে নেবার জন্য বাহিনী তৈরি করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ গ্রহন করার পরে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর ডাকে এপ্রিল মাসে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। তোবারক হোসেন লুডুর নেতৃত্বে দেরশতাধিক এলাকার যুবক নিয়ে একটি মুক্তি বাহিনী তৈরি করেন। বাঘের মত সাহস এবং কৌশলে লোকমান একটি বেটাগান হাতে নিয়ে সকল যোদ্ধদের হাতে ভারি অস্ত্র নিয়ে সকলে একত্রিত হয়ে মানিকগঞ্জে পাকিস্থানি হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ও সফল যুদ্ধ করেন গোলাইডাঙ্গায়। যুদ্ধে যাবার আগে সহযোদ্ধাদের বলেন, আমি ফাঁয়ার করার পরে তোমরা ফাঁয়ার করবে। ৭/৮ নৌকায় করে পাকিস্থানি সেনারা যখন ক্যাপের দিকে আসতে থাকে তখন পেছন দিক থেকে কৌশলে লোকমান ব্যাশ ফায়ার করেন। এবং একজন সেনাকে গেরিলারমত গলা চেপে ধরে তার অস্ত্র নিয়ে আসে এবং তাকে ফাঁয়ার করে হত্যা করে। এই যুদ্ধে ৮১ জন পাকিস্থানি সেনা নিহত হয়। এখান থেকে সহযোদ্ধারা লোকমান হোসেনকে টাইগার লোকমান উপাধি দেয়।
মানিকগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তোবারক হোসেন লুডুর নেতৃত্বে লোকমান, জাহিদ, লুৎফর, চাঁন মিয়া, ননী মিয়া, আঃ সালাম, ইয়াকুব, হারুন, ওয়াজেদ, হেকমত আলী প্রায় দেরশতাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ ছিল। তাদের গ্রুপের নেতৃত্বে পাকিস্থানি ক্যাম্পে প্রথম হামলা চালান হয়। পরে ২২ জুন ঘিওর থানা আক্রমনের পরে চারিগ্রাম লালডুবাই হানাদার বাহিনীদের আক্রমন করে এবং মানিকগঞ্জের পুলিশ ক্যাম্প আক্রমন করেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়াডিঙ্গী ব্রিজ অপারেশন, চারিগ্রামের যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশ গ্রহন করেন। ২৯ অক্টোবর সিংগাইরে গোলাইডাঙ্গা ৩০/৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সরাসরি যুদ্ধের পরে বাস্তানবগ্রামে সরে পরেন। এ সময় সবাই ছিল যুবক। পরে ২ সেপ্টেম্বর টাইগার লোকমানকে কমান্ডার করেন সহযোদ্ধারা।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে তিনি জানান, বয়সের ভারে খুব বাইরে যাওয়া হয়না। বর্তমানে তার নিজের তৈরি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষন কেন্দ্রে সময় কাটে। ৭ মার্চের জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ১৮ মিনিটের একটি ভাষন সারা বিশে^ জাতীয় ভাষন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছুই হতে পারেনা। গর্ভে আমাদের বুকটা ভরে যাচ্ছে। “মুক্তিযোদ্ধাকে জান” নামে টাইগার লোকমানের একটি সংগঠন রয়েছে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করেন। তার বাড়িতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষন কেন্দ্র। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় ৪ নেতা, ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী, মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া সহ প্রায় ৪ শতাধিক বিশিষ্ঠ ব্যক্তি বর্গের ছবি। নতুন প্রজন্ম শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য লোকজন দেখার জন্য ভীড় করেন। বেশীর ভাগ সময় কাটে তার নিজের মুক্তিযুদ্ধের সংরক্ষন কেন্দ্রে। তার উপরে সংসারে ঝামেলা নিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে কাটে তার প্রতিটি দিন। রোজগারের কোনো পথ নেই। মুলত ১০ হাজার টাকা ভাতার উপর নির্ভর করে চলে তার ২টি প্রোগাম। তার পরেও বুকভরা ভালবাসা, আর শ্রদ্ধ রয়েছে সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষন কেন্দ্রটি উন্নয়নের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

সম্প্রতি সংবাদ