বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ০৪:০১ পূর্বাহ্ন

কালিহাতীতে দুই ভাইয়ের একজন সাংসদ অন্যজন উপজেলা চেয়ারম্যান টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবারের রাজনীতির পালে হাওয়া!

প্রতিনিধির নাম:
  • আপডেট করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪
  • ৯৪ দেখা হয়েছে:

বুলবুল মল্লিক,টাঙ্গাইল :৩০ মে-২০২৪,বৃহস্পতিবার।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী সিদ্দিকী পরিবারের রাজনীতির পালে নতুন করে হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের কোণঠাসা পরিস্থিতি কাটিয়ে সিদ্দিকী পরিবারের বড় ছেলে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৪(কালিহাতী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভোটে(২১ মে) তার ছোট ভাই শামীম আল মনসুর সিদ্দিকী ওরফে আজাদ সিদ্দিকী উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দুই ভাইই উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। এরপর থেকে জেলা-উপজেলার রাজনীতিতে ঐতিহ্যবাহী সিদ্দিকী পরিবারের আধিপত্য অনেকটা মজবুত হওয়ায় টাঙ্গাইলের রাজনৈতিক অঙ্গণে তাদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী সিদ্দিকী পরিবারের পৈত্রিক ভিটা কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী ইউনিয়নের ছাতিহাটী গ্রামে। শহরে ‘সিদ্দিকী কটেজ’ নামে তাদের একটি বাসস্থান রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কিংবদন্তিতুল্য অবদান রাখা সিদ্দিকী পরিবারের সদস্যরা সব সময়ই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ^াসী। এ পরিবারের বড় ছেলে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিজেকে একজন সাচ্চা আওয়ামীলীগার হিসেবে দাবি করেন- যদিও নানা কারণে তিনি একাধিকবার দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। কালিহাতীর আওয়ামী রাজনীতির নেতা-কর্মীরা মূলত তাঁর হাতে গড়া। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জাতীয় সংসদের
টাঙ্গাইল-৪(কালিহাতী) আসন থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপমহাদেশের প্রথম মহিলা(স্বতন্ত্র) সংসদ সদস্য হয়েছেন।
২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রীত্ব পান। আওয়ামীলীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য পদ লাভ করেন। ২০১৪ সালে বিদেশে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার ও মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়। পরে তিনি জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর নির্বাচনী আসন কালিহাতীতে আসা বন্ধ করেন- অনুসারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এরপর উপ-নির্বাচনে মোহাম্মদ হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন থেকে লতিফ সিদ্দিকী
কালিহাতীর রাজনীতি থেকে নিজকে গুটিয়ে নেন। ফলে তাঁর অনুসারীরা বেকায়দায় পড়েন। এ সুযোগে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের ২৭ কর্মীকে ৭১ সদস্যের উপজেলা আওয়ামীলীগের পদ-পদবীতে বসানোর প্রয়াস পান। নেতাদের অন্তদ্বন্দ্বের কারণে ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনের দীর্ঘ ২০ মাস পর জেলা আওয়ামীলীগ কালিহাতী উপজেলা আওয়ামীলীগের কার্য নির্বাহী কমিটির অনুমোদন দেন। উপজেলা আওয়ামীলীগে পদ-পদবী পাওয়া ২৭ জনের মধ্যে অধিকাংশকেই উপজেলার ত্যাগী আওয়ামীলীগাররা ‘হাইব্রিড’ হিসেবে
আখ্যায়িত করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। ফলে উপজেলা আওয়ামীলীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। দলের ভেতরের অন্তকলহ নানা সময়ে প্রকাশ্যে বেড়িয়ে আসে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লতিফ সিদ্দিকী আবার কালিহাতীতে যাতায়াত শুরু করেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তিনি ট্রাক প্রতীকে ৭০ হাজার ৯৪০ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার প্রার্থী ছিলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের টানা ৩২ বছরের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোজাহারুল ইসলাম তালুকদার। তিনি পান ৫৪ হাজার ৭৫ ভোট। এ নির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকীর অনুসারী আওয়ামী লীগাররা তাঁর ট্রাক প্রতীককে নির্বাচিত করতে মাঠে নামেন। এক্ষেত্রে উপজেলা আওয়ামীলীগের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচিত হন। ওই সময় লতিফ সিদ্দিকীর পাশে ছিলেন তাঁর
ছোটভাই বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম ও শামীম আল মনসুর সিদ্দিকী ওরফে আজাদ সিদ্দিকী। ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে কালিহাতী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ছোট ভাই এসএএম সিদ্দিকী ওরফে আজাদ সিদ্দিকী চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লাকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন।
নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা আজাদ সিদ্দিকী বঙ্গের আলীগড় খ্যাত সরকারি সা’দত কলেজ ছাত্র-সংসদের সাবেক এজিএস এবং ভিপি। তিনি আনারস প্রতীকে ৫২ হাজার ৯১০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মোল্লা মোটরসাইকেল প্রতীকে ৪৫ হাজার ৬৮৫ ভোট পান। সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লাকে পুরো উপজেলা আওয়ামী লীগ সমর্থন দেয়। আনোয়ার হোসেন মোল্লা দুঃসময়ে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী যুবলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার ছোটভাই নূরে এ আলম সিদ্দিকী উত্তরবঙ্গের প্রবেশপথ এলেঙ্গা পৌরসভার বর্তমান মেয়র।
উপজেলা নির্বাচনে আজাদ সিদ্দিকীর (আনারস) পক্ষে তাঁর বড়ভাই বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম বেশ কয়েকটি নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়ে ভাইয়ের জন্য ভোট চেয়েছেন। আওয়ামীলীগের সভাপতি মন্ডলীর সাবেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী বড়ভাই আবদুল লতিফ সিদ্দিকী স্থানীয় সংসদ সদস্য হওয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ না নিলেও ছোটভাই আজাদ সিদ্দিকীকে প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। এমপির অনুসারী ও কর্মীরা আনারসের পক্ষে ভোটের মাঠে কাজ করেন। এদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লার মোটরসাইকেল প্রতীকের পক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা একাট্টা হয়ে মিটিং-মিছিল ও গণসংযোগ করেছেন। ত্যাগী ও হাইব্রিড বলে চিহ্নিত সবাই একত্র হয়ে ভোট চেয়েছেন। সাবেক সংসদ সদস্য হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মোজহারুল ইসলাম তালুকদার, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনসার আলী ও জেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক আবু নাসেরসহ বিভিন্নস্তরের নেতা-কর্মীরা আনোয়ার হোসেন মোল্লার পক্ষে কাজ করেন।
উপজেলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সিদ্দিকী পরিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো কালিহাতী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও নির্বাচিত হয়ে তাদের আধিপত্য ধরে রাখল। কালিহাতীতে দুটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের পরাজয়ের ফলে সাময়িকভাকে দল বড় ধাক্কা খেয়েছে। পরাজয়ের নেপথ্যে সিদ্দিকীদের জনপ্রিয়তা এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই মূল কারণ।
সিদ্দিকী পরিবারের অনুসারীরা মনে করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা
পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় কালিহাতীতে তাঁদের অবস্থান অনেকটা সুসংহত
হয়েছে। আবারও কালিহাতী তথা টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে সিদ্দিকী পরিবারের
সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। পক্ষান্তরে উপজেলা আওয়ামীলীগের অভ্যন্তরীণ
দ্বন্দ্ব-বিরোধ স্পষ্ট হয়েছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লা জানান, যারা
জাতীয় নির্বাচনে ট্রাকের পক্ষে ইলেকশন করেছে- তারাই উপজেলা নির্বাচনে
আনারসের নির্বাচন করেছে। এ দুটি নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে স্থানীয় আওয়ামী
লীগ অবশ্যই ধাক্কা খেয়েছে। বড়ভাই এমপি হওয়ায় ছোটভাইতো নির্বাচনে কৌশলগত
কারণেই সুবিধা পাওয়ার কথা। উপজেলা নির্বাচনের পর তার কয়েকজন কর্মীকে
মারধরের অভিযোগ করেন তিনি।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক আবু নাসের জানান,
সকল পরাজয়েরই গ্লানি থাকে- যা নেতাদের চেয়ে কর্মীরা বেশি বয়ে বেড়ায়।
বর্তমানে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা
স্বাভাবিকভাবেই হতাশ এবং নানা মেরুকরণে বিভক্ত। আগামি দিনে দলকে ঐক্যবদ্ধ
করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত
প্রার্থী মোজহারুল ইসলাম তালুকদার জানান, কালিহাতীর কতিপয় নেতার বেঈমানীর
কারণে জাতীয় নির্বাচনে এখানে নৌকা প্রতীক পরাজিত হয়েছে। এমপি এবং উপজেলা
নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে আওয়ামীলীগ সাময়িক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাদের নেতা। তাঁর নির্দেশেই দলকে
গুছানোর চেষ্টা করবেন। তবে সিদ্দিকী পরিবারের দুই ভাইয়ের কারণে আওয়ামী
লীগের প্রতি অন্যায়-অবিচার হলে সেটা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করা হবে।
নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ সিদ্দিকী জানান, কালিহাতীর মানুষ
সিদ্দিকী পরিবারকে ভালবাসে। তারাও কালিহাতীর মানুষকে তাদের পরিবার মনে
করেন। তার পরিবার মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর স্নেহ
পেয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বাইরের কেউ নন। কালিহাতীর মানুষ
ভোট দিয়ে তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে
কাঙ্খিত কালিহাতী গড়ে তুলবেন। আজাদ সিদ্দিকী আরও জানান, তার কর্মীদের
মারধর ও হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে স্থানীয়রা ইতোমধ্যে সভা করেছে।

আর্টিকেলটি শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরো খবর
© All rights reserved ©
themesba-lates1749691102