সৈয়দপুরে জিআই তার ফ্যাক্টরীর বিষাক্ত এসিডে ঝলসে গেছে ৩০ শতক জমির ফলন্ত ভুট্টা গাছ

editor ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ সারাদেশ

শাহজাহান আলী মনন সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ২৫ এপ্রিল-২০২১,রবিবার।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে কৃষি জমিতে গড়ে ওঠা জিআই তার তৈরির ফ্যাক্টরী থেকে নির্গত বিষাক্ত এসিডে ঝলসে গেছে ৩০ শতাংশ জমির ফলন্ত ভুট্টা ক্ষেত। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক এর প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন সুরাহা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। সেই সাথে অভিযোগ করার কারনে ফ্যাক্টরী কর্তৃপক্ষ নানা ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়ায় জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সরকারপাড়ার মৃত মনসুর আলী সরকারের ছেলে নাজমুল হুদা সরকার জানান, কামারপুকুর ডিগ্রি কলেজের দক্ষিণে কামারপুকুর বাজার থেকে বয়ে যাওয়া খাল ও সড়ক সংলগ্ন আমার ১২০ শতক কৃষি জমি আছে। এই জমির পাশেই গত প্রায় ৫ বছর আগে আবাদী কৃষি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে “এলাহী কুটির শিল্প” নামে একটি জিআই তার ও তারকাঁটা তৈরির ফ্যাক্টরী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এই ফ্যাক্টরী থেকে বর্জ্য হিসেবে বিষাক্ত উত্তপ্ত পানি ও সালফার এসিড নির্গত হয়। বিগত প্রায় ৩ বছর যাবত এই বর্জ্যের প্রভাবে আমার উর্বর তেফসলী জমিতে আবাদ কম হওয়াসহ ফলন্ত ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিগত বছরের মত এবার আমি ওই জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতক জমির ফলন্ত ভুট্টা গাছ ফ্যাক্টরীর বিষাক্ত এসিডে ঝলসে গেছে। আর কয়েকদিন পরই ভুট্টাগুলো তুলতে পারতাম। কিন্তু ফ্যাক্টরীর এসিড নির্গত হওয়ার পথটা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানোর পরেও তারা গুরুত্ব না দেয়ায় এমন ক্ষতির মুখে পড়লাম।
আগের দুই বছরও এভাবে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় ফ্যাক্টরীর মালিক কে বিষয়টি অবগত করে নিরাপদে এসিড ও গরম পানি ঝুঁকিমুক্তভাবে নিঃসরণের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানিয়েছি। কিন্তু তারা সে কথা কানে নেয়নি। ক্ষতিপূরণ হিসেবে যৎসামান্য টাকা দিয়ে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়েছে। কিন্তু এবার আমার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এবার ফসলের ক্ষতির বিষয়ে ফ্যাক্টরীর মালিক জমসেদকে জানাতে গেলে তিনি না থাকায় তার জামাতা বদরু অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি বলেন আমার ফ্যাক্টরীর কারণে ভুট্টার কোন ক্ষতি হয়নি। এ ব্যাপারে আর কখনো আমার কাছে আসবেন না। কোন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবেনা।
এতে বাধ্য হয়ে প্রতিকার চেয়ে গত ১১ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা কৃষি অফিসার এবং জেলা প্রশাসক কে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও কেউ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি কৃষি বিভাগের কেউ অভিযোগ তদন্তেও আসেনি। ফলে বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয়ে দেখা দেয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।
এদিকে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করায় ফ্যাক্টরী কর্তৃপক্ষ নানা ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এতে জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় আছি।  একদিকে ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছি। অন্যদিকে প্রশাসনের নিরবতায় প্রভাবশালী শিল্প মালিকের লোকজনের হুঙ্কারে সন্ত্রস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। অভিযোগ করে প্রতিকার তো দূরের কথা উল্টো আরও বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এ ব্যাপারে এলাহী কুটির শিল্প’র ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন,  কয়েকদিন হলো আমি এখানে যোগদান করেছি। তাই এ ব্যাপারে কোন কিছু বলতে পারবোনা। তবে নাজমুল হুদা’র জমিই ভালো না। তাই ফসল হয়না। এতে ফ্যাক্টরীর কোন দায় নেই। আগে তো ফসল নষ্ট হয়নি। আবাদও শতভাগ হয়েছে। এখন কেনো হচ্ছেনা? জমি খারাপ হয়েছে কেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
ফ্যাক্টরী মালিক পক্ষের প্রতিনিধি মোঃ বদরু’র সাথে মুঠোফোন কথা হলে তিনি উদ্ধত্বপূরৃণ ভাষায় বলেন, যেখানে কৃষি অফিস, ইউএনও এবং ডিসি কে অভিযোগ করেছে। তারা যখন কিছু বলছেনা। সেখানে আপনাদের এতো তাগাদা কেনো। আপনারা কি ওই কৃষকের উপদেষ্টা হয়েছেন? ফ্যাক্টরীর জন্য ফসলের কোন সমস্যা হয়নি। হলে অন্য জমিতেও হতো। আমরা কোন ক্ষতিপূরণ দিবোনা। যা করার আছে করেন।
কামারপুকুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আনোয়ার হোসেন সরকার বলেন, অবশ্যই ফ্যাক্টরীর বিষাক্ত এসিডের কারনেই এভাবে ভুট্টা ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কামারপুকুর ইউনিয়নের ইটভাটা ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত ক্ষতিপূরণ দিয়েই কৃষকদের সাথে সহাবস্থান বজায় রেখেছে। আপনার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হবে আর আপনি দাপট দেখিয়ে উল্টো হুমকি দিয়ে কৃষককে দাবিয়ে রাখবেন তা করতে দেয়া হবেনা।
উপজেলা কৃষি অফিসার শাহিনা বেগমের সাথে মুঠোফোন কথা হলে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু যেরকম (লকডাউন) সময় চলছে তাই বিষয়টি দেখার সুযোগ হয়নি। ১৫ দিনেও কেন কৃষি অফিসের কেউ ঘটনাস্থলে আসেনি। এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই রমজানেও আমরা কৃষি ও কৃষকের পাশে আছি। অথচ আপনারা (সংবাদকর্মীরা) আমাদের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করছেন। আপনাদের বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার। ওই কৃষকের ব্যাপারে যখন ইচ্ছে হবে তখন দেখবো। আপনাদের কথায় কি আমাকে চলতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান উপজেলা কৃষি অফিসার কখনোই মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে যান না। তাছাড়া তাঁর শ্বশুর বাড়ি সৈয়দপুরে হওয়ায় যাচ্ছেতাইভাবে চলেন। লকডাউনেও জনসমাবেশ করে ট্রেনিংয়ের নামে মিষ্টি বিতরণের হাঙ্গামা করলেও ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের অভিযোগ আমলে না নিয়ে লকডাউনের অজুহাতে কালক্ষেপণ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে এক্ষেত্রে ফ্যাক্টরী মালিকপক্ষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েও থাকতে পারেন তিনি।

সম্প্রতি সংবাদ